যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মোদির এই ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোকে চাপে ফেলা এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা অন্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করা। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া তৃতীয় পক্ষের ওপরও ‘সেকেন্ডারি’ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ঘোষণা দিল্লির পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফলে ওয়াশিংটনের চাপের মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার সিদ্ধান্ত ভারতের বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত ও ইরানের সম্পর্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং কৌশলগত সহযোগিতার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানসহ বিস্তৃত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত-ইরান বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে চাপে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। ভারত ইরানে প্রধানত চাল, চা, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। কিন্তু অর্থ লেনদেন, পরিবহন এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধ ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় বাণিজ্য বাড়ানোর মোদির ঘোষণা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক লেনদেনের বাধা। ভারতের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং, শিপিং ও বীমা খাতে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করা প্রয়োজন হতে পারে।
বৈঠকে শুধু বাণিজ্য নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মোদি নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা এবং সমুদ্রপথে নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতসহ এশিয়ার বহু দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব দেশটির বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে পড়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবুও তেহরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ভারতের জন্য ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো নিজেদের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় রাখা। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দিল্লিকে একই সঙ্গে দুই দিকের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
মোদির এই অবস্থান তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির ঘোষণা নয়; এর মধ্যে ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখা—এই ভারসাম্য ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি মোকাবিলা করে ভারত কীভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়লে তা শুধু ভারত ও ইরানের অর্থনীতির জন্য নয়, বরং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং জটিলতা, পরিবহন ব্যয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিই এই উদ্যোগের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ভারতের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দিল্লির এই অবস্থান আগামী দিনে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং ভারত-ইরান বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।