নেপালে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও কাজের নির্দেশনা জারি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকায় কাজ করতে যাওয়া বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানায়, বন্যাকবলিত এলাকায় সাংবাদিকদের কাজের জন্য দেশটির তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা ও কাজের একটি বিশেষ প্রটোকল জারি করেছে। এতে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিজেদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সাংবাদিকদের অবশ্যই বৈধ প্রেস পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী, উদ্ধারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। নির্ধারিত পথ ব্যবহার এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরোপ করা চলাচলের বিধিনিষেধ অনুসরণ করার কথাও বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে সাংবাদিকদেরও সেই নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে। অনুমতি ছাড়া সক্রিয় উদ্ধার এলাকায় প্রবেশ করা যাবে না। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকেও সাংবাদিকদের বিরত থাকতে হবে।
এ ছাড়া নিষিদ্ধ বা সীমিত অপারেশন এলাকায় প্রবেশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করতেও সাংবাদিকদের নিষেধ করা হয়েছে। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় এসব নির্দেশনা অমান্য করলে সাংবাদিকদের নিজেদের জীবন যেমন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তেমনি উদ্ধার তৎপরতাও ব্যাহত হতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
নেপালের বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ভয়াবহ হিমবাহ ধস। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ও পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোতেকোশি নদীর পানির প্রবল স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, যানবাহন, সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও।
দুর্যোগের ভয়াবহতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে উদ্ধারকাজ নির্বিঘ্ন রাখা কর্তৃপক্ষের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
বিদেশি সাংবাদিকদের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নেপালের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে বিদেশি সাংবাদিকদের অনলাইনে প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন ও সাংবাদিক পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সময় বিদেশি সাংবাদিকদের বৈধ ভিসা বা প্রবেশ অনুমতিসহ পাসপোর্টের কপি, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের পরিচয়পত্র এবং সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশপত্র জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে নিজ দেশের দূতাবাস, কনস্যুলার অফিস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশপত্রও প্রয়োজন হবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেওয়া প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন ও সাংবাদিক পরিচয়পত্র সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
তবে নেপালের তথ্য বিভাগের মুখপাত্র গোবিন্দ প্রসাদ পাণ্ডে জানিয়েছেন, বিদেশি সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নতুন কোনো নীতি নয়। এটি দেশটির দীর্ঘদিনের বিদ্যমান নিয়ম ও প্রক্রিয়ার অংশ। বর্তমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গত মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি, উদ্ধার কার্যক্রম, ক্ষয়ক্ষতি এবং ত্রাণ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে তথ্য দিতে সংবাদকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে একই সঙ্গে বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ, নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য কিংবা উদ্ধার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
নেপালের কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনায় তাই সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে সক্রিয় উদ্ধার এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়া এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নেপালের এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা—দুই বিষয়ই নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।