Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

শুধু মানবিক সংকট নয়, রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শুধু মানবিক সংকট নয়, রোহিঙ্গা ইস্যু এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকটকে এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অবস্থান দেশের ওপর যেমন বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে, তেমনি এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ছে। সংকট সমাধানে যত দেরি হবে, বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি তত বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) অডিটোরিয়ামে রোহিঙ্গা সংকটের চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের কৌশল নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন এ আলোচনার আয়োজন করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বিশেষভাবে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ও সীমানা নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, ক্যাম্পের পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সমস্যার মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নানা ধরনের সমস্যা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ক্যাম্পে মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, সংকটও তত বেশি জটিল হবে। তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে মানবিক সহায়তা কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়াই সংকটের মূল সমাধান বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কার্যকর সমাধান কঠিন হবে বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাত, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘদিনের শরণার্থী সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। ফলে সংকট মোকাবিলায় শুধু বাংলাদেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; আঞ্চলিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস, সীমিত সম্পদ এবং মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কাও রয়েছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালন করা। একদিকে রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সম্প্রতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই মানবিক সহায়তা, ক্যাম্পের নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন—এই চারটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।