সিরাজগঞ্জে পৃথক দুটি মাদক মামলায় মা-মেয়েসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের আরও দুই বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-৩ আদালতের বিচারক লায়লা শারমিন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় তিন আসামিই পলাতক ছিলেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—গাইবান্ধা জেলার পালাশপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে মারুফ উল ইসলাম এবং রংপুর জেলার পীরগাছা থানার তালুক পশুরাম গ্রামের হাবিবুর রহমানের স্ত্রী মোবাশেরা বেগম ও তার মেয়ে সেলিনা বেগম। আদালতের রায়ে পৃথক দুটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে আনা মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই সাজা দেওয়া হয়। মামলার নথি ও আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্তরা মাদক পরিবহন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে। ওই সময় যমুনা সেতু পশ্চিম গোলচত্বর এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালাচ্ছিল। রংপুর থেকে ঢাকাগামী ‘খালেক এন্টারপ্রাইজ’-এর একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালানোর সময় মোবাশেরা বেগম ও তার মেয়ে সেলিনা বেগমের কাছ থেকে ৭০ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয় বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।
মামলার দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালের ৯ মার্চ। সেদিন রাতেও যমুনা সেতু পশ্চিম গোলচত্বর এলাকায় মাদকবিরোধী তল্লাশি চালাচ্ছিল র্যাব-১২। রাত আনুমানিক ২টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ‘নাহার এন্টারপ্রাইজ’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় বাসের যাত্রী মারুফ উল ইসলামের পায়ের কাছে থাকা একটি ব্যাগ থেকে ৭৯ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে এ ঘটনায় র্যাব-১২-এর পক্ষ থেকে মামলা করা হয়।
দুটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সাক্ষ্যগ্রহণ ও উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। বুধবার আদালত পৃথক দুটি মামলার রায় ঘোষণা করে তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় তিন আসামির কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তারা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর করতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আদালতের এ রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা পৃথক দুটি মাদক মামলার বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।
সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু পশ্চিম গোলচত্বর দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের একটি অংশ। এই এলাকায় অতীতে মাদক পরিবহন ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম চালানোর ঘটনা বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। আন্তঃজেলা সড়কপথ ব্যবহার করে মাদক এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে এ ধরনের তল্লাশি কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া মামলায় আদালতের দেওয়া সাজা মাদক পরিবহন ও পাচারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপেরই অংশ। তবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এ মামলায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায়ের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে।
একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ, পরিবহনের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। সিরাজগঞ্জের এ দুই মামলায়ও পুলিশ ও র্যাবের অভিযানের পর পৃথক মামলা, তদন্ত, অভিযোগপত্র এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। আদালতের রায়ে আসামিদের প্রত্যেকের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার জন্য মাদক পাচার একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ ঠেকাতে পরিবহনপথগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যমুনা সেতু পশ্চিম এলাকায় সংঘটিত এ দুটি মামলাও সেই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য।
আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দুটি মাদক মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এখন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে।