জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আগামী সপ্তাহে ঘোষণা হতে পারে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারিত হতে পারে। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
মামলাটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর একটি। এতে ওবায়দুল কাদেরের পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ মোট সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার সব আসামিই বর্তমানে পলাতক বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটির উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। তখন ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছিল, যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করা হতে পারে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে আসামিরা বিভিন্নভাবে নির্দেশনা, উসকানি ও সহায়তা দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশন এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে তাদের খালাস দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। ফলে আগামী সপ্তাহে ট্রাইব্যুনালের রায়ে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে কি না এবং হলে আসামিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের সাজা দেওয়া হবে—সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
মামলার শুনানি চলাকালে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকা নিয়েও ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়। গত ৬ আগস্ট শুনানিতে একটি অডিও রেকর্ড আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী ওবায়দুল কাদেরকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলা নিয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। তবে এসব উপস্থাপিত তথ্য ও অভিযোগের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবে ট্রাইব্যুনাল।
মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ উভয়েই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। প্রসিকিউশন বলেছে, অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ তারা উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের বক্তব্য, অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে। এখন বিচারিক প্যানেল উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি ও যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবে।
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনগত মহলেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এই মামলার রায় পরবর্তী সময়ে একই ধরনের অন্যান্য মামলার বিচারপ্রক্রিয়াতেও আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
তবে রায় ঘোষণার আগে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না। আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। আগামী সপ্তাহে রায় ঘোষণার পরই মামলার অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হবে।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন রায় ঘোষণা হতে পারে। নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানানো হবে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর বহুল আলোচিত এই মামলার রায় তাই রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।