Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

নিলামে কেনা স্থাবর সম্পত্তিতে ১৫% ভ্যাট নয়, হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

নিলামে কেনা স্থাবর সম্পত্তিতে ১৫% ভ্যাট নয়, হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে বিক্রি হওয়া স্থাবর সম্পত্তির ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নিলাম ক্রেতার কাছ থেকে নিলামমূল্যের ওপর উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের নির্দেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। একই সঙ্গে স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে ‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা বিতর্কিত এসআরওর সংশ্লিষ্ট অংশকেও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হয়েছে।

বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) আদালত রায় ঘোষণা করলেও বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিলামে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট নিয়ে যে আইনি প্রশ্ন ছিল, সেটির বিষয়ে হাইকোর্টের অবস্থান স্পষ্ট হলো।

মামলার নথি অনুযায়ী, একটি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান কার্যকরী মূলধনের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। পরবর্তী সময়ে ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ জারি মামলা দায়ের করা হয় এবং অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(১) ধারার অধীনে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তোলা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্পত্তিটি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে আবেদনকারীরা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকায় সম্পত্তিটি কিনে নেন।

নিলামে সর্বোচ্চ দর অনুমোদিত হওয়ার পর ক্রেতারা সম্পূর্ণ নিলামমূল্য আদালতে জমা দেন। অর্থঋণ আদালত ওই অর্থ এবং পাউন্ডেজ ফি গ্রহণের পর নিলামমূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প ডিউটি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশ নিয়েই তৈরি হয় আইনি জটিলতা। নিলাম ক্রেতাদের দাবি ছিল, বিচারিক নিলামের মাধ্যমে কেনা স্থাবর সম্পত্তির ওপর এভাবে ভ্যাট আরোপের আইনগত ভিত্তি নেই।

পরিস্থিতিতে নিলাম ক্রেতারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর আগে গত ৮ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ বিষয়ে রুল জারি করেন। ওই রুলে নিলাম ক্রেতাদের ওপর স্ট্যাম্প শুল্কসহ ১৫ শতাংশ ভ্যাট জমা দেওয়ার নির্দেশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতের ওই নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে রুল ও সম্পূরক রুলের শুনানি বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের বেঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়। নিলাম ক্রেতাদের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান এবং আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব ও অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও উপস্থাপিত আইনি যুক্তি পর্যালোচনার পর আদালত রুল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেন।

রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেন, নিলাম ক্রেতাদের নিলামমূল্যের ওপর উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে অর্থঋণ আদালত যে আদেশ দিয়েছিল, সেটি আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছে এবং এর কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই। অর্থাৎ বিচারিক নিলামের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে শুধু নিলাম ক্রেতা হওয়ার কারণে ওই সম্পত্তির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের নির্দেশ কার্যকর করা যাবে না।

আদালত বিতর্কিত এসআরওর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়েও অবস্থান জানিয়েছেন। ওই এসআরওতে স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে ‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। হাইকোর্ট এই অংশকেও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করেন। এর ফলে অধস্তন বা অর্পিত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তির নিলাম ক্রেতার ওপর নতুন করে ভ্যাটের দায় চাপানোর সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হলো।

হাইকোর্টের রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংসদ যদি কোনো সম্পত্তির বিক্রয় বা হস্তান্তরকে আইন দ্বারা ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেয়, তাহলে কেবল অধস্তন আইন বা এসআরও জারি করে সেই সম্পত্তির ওপর নতুন করে করের দায় সৃষ্টি করা যায় না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ কর আরোপের ক্ষেত্রে মূল আইন ও অধস্তন আইনের সীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, এই রায় দেশের বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য পরিচালিত বিচারিক নিলাম এবং নিলামের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকঋণ আদায়ের মামলায় বন্ধকি জমি, ভবন বা অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি হলে ক্রেতাদের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রশ্নে এখন এই রায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে রায়ের প্রভাব বুঝতে বিচারিক নিলামে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য ধরনের নিলাম বা সম্পত্তি হস্তান্তরের মধ্যে পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা জরুরি। হাইকোর্টের বর্তমান রায়টি মূলত অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে বিক্রি হওয়া স্থাবর সম্পত্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। তাই সব ধরনের নিলাম বা সব ধরনের সম্পত্তি লেনদেনে একই সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশে ব্যাংকঋণ আদায় এবং বন্ধকি সম্পত্তি নিলামের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আইনি ও আর্থিক জটিলতা রয়েছে। নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর অতিরিক্ত কর বা ফি আরোপের কারণে ক্রেতাদের ব্যয় বেড়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে নিলাম প্রক্রিয়ার আকর্ষণও কমতে পারে। এই বাস্তবতায় হাইকোর্টের বর্তমান রায় বিচারিক নিলামে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়কারী ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে নিলামে কেনা স্থাবর সম্পত্তির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা কর আইন, ব্যাংকঋণ আদায় এবং বিচারিক নিলাম—তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংসদীয় আইনের বাইরে অধস্তন বিধি বা এসআরওর মাধ্যমে নতুন করদায় সৃষ্টির সীমাবদ্ধতাও আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নিলামে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে এই রায়ের আইনি প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।