টুথপেস্টসহ প্রতিদিনের ব্যবহৃত বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি যাচাই করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এসব পণ্যের মান যাচাইয়ের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় জাতীয় মান ও পরীক্ষাপদ্ধতি নির্ধারণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান।
সম্প্রতি দেশে বাজারজাত বিভিন্ন টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার দাবি নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। একটি বেসরকারি গবেষণায় বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। বিষয়টি সামনে আসার পর বিএসটিআই নিজস্বভাবে নমুনা সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়।
শিল্পমন্ত্রী জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি যাচাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। তাদের তত্ত্বাবধানে বাজার ও উৎপাদনকারী কারখানা থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ বা বিসিএসআইআরে পাঠানো হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশের টুথপেস্টের জন্য জাতীয় মানদণ্ড থাকলেও সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিককে আলাদাভাবে নিষিদ্ধ করার বিধান নেই। তবে টুথপেস্ট উৎপাদনে অনুমোদিত ৮১টি উপাদানের একটি তালিকা রয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক তুলনামূলকভাবে নতুন ধরনের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। বিদ্যমান জাতীয় মানদণ্ডে এটি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বিএসটিআইয়ের নিজস্ব পরীক্ষাগারে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ছিল না। এ কারণে প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
শুধু টুথপেস্ট নয়, ভবিষ্যতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ক্ষতিকর প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, পণ্যের গায়ে ব্যবহৃত উপাদানের স্পষ্ট ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণের জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষাপদ্ধতি জাতীয় মানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা কত হবে এবং কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তা পরীক্ষা করা হবে—এসব বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিসিএসআইআর থেকে পাওয়া পরীক্ষার ফলাফল ও বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড হালনাগাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী।
এদিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করলেও পরীক্ষাগারভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া কোনো পণ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত না করার আহ্বান জানিয়েছে বিএসটিআই। প্রতিষ্ঠানটির মতে, গবেষণার ফলাফল যাচাই করে আইন ও জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে যথাযথ প্রক্রিয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় কোনো পণ্যে অননুমোদিত উপাদান বা নির্ধারিত মানের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারক কিংবা আমদানিকারকের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকি অব্যাহত রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বিএসটিআইয়ের এই উদ্যোগকে ভোক্তা নিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ তথ্য, পরীক্ষার ফলাফল এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।