Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

ট্রাইব্যুনালে মাঝির বিস্ফোরক সাক্ষ্য: ‘জিয়া স্যার’ বন্দিদের হত্যা করে নদীতে ফেলতেন

ট্রাইব্যুনালে মাঝির বিস্ফোরক সাক্ষ্য: ‘জিয়া স্যার’ বন্দিদের হত্যা করে নদীতে ফেলতেন

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র‍্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান গুম ও হত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক। তাঁর দাবি, ২০১০ ও ২০১১ সালে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় র‍্যাবের অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের গুলি করে হত্যার পর লাশ গুম করতে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। লাশ যাতে পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর একক বেঞ্চে মামলাটির দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আব্বাস মল্লিক। তাঁর সাক্ষ্যে ২০১০ ও ২০১১ সালের বিভিন্ন অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের কথিত হত্যা ও লাশ গুমের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। আব্বাস মল্লিক নিজেকে ওই সময়কার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ট্রলার মাঝি হিসেবে উল্লেখ করেন।

আব্বাস মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় র‍্যাবের অভিযান পরিচালনার দিন বিকেলে সাদা পোশাকে কয়েকজন র‍্যাব সদস্য স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করে দিতে এবং বাতি নিভিয়ে রাখতে বলতেন। এরপর গভীর রাতে র‍্যাবের কয়েকটি মাইক্রোবাস স্থানীয় একটি বরফ মিলের সামনে এসে থামত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় আটক ব্যক্তিদের সেখানে নিয়ে আসা হতো। পরে তাদের ট্রলারে তুলে নদীর দিকে নিয়ে যাওয়া হতো বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন তিনি।

সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক আরও বলেন, বন্দিদের নিয়ে যাওয়ার সময় র‍্যাব সদস্যদের সঙ্গে রশি ও সিমেন্টের বস্তা থাকত। ট্রলারটি বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে পৌঁছানোর পর গতি কমিয়ে দেওয়া হতো। এরপর চোখ ও হাত বাঁধা ব্যক্তিদের একজন একজন করে ট্রলারের বাইরে আনা হতো। তাঁর দাবি, ট্রলারের দুই পাশে থাকা অংশে দুই র‍্যাব সদস্য বন্দিদের চেপে ধরে রাখতেন এবং এরপর জিয়াউল আহসান এসে তাদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন।

আব্বাসের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, গুলি করে হত্যার পর মৃতদেহের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে দেওয়া হতো। এরপর লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। লাশ যেন ভেসে উঠতে না পারে, সে জন্য নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর এই সাক্ষ্য মামলায় কথিত গুম ও হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে।

শুধু বলেশ্বর নদীতে লাশ ফেলার অভিযোগই নয়, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় আটক ব্যক্তিদের হত্যা করে পরে ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপনেরও অভিযোগ করেছেন এই সাক্ষী। তাঁর দাবি, কয়েকজনকে সুন্দরবনে নিয়ে যাওয়ার পর গুলি করে হত্যা করা হতো এবং পরে সাংবাদিকদের ডেকে ঘটনাটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দেখানো হতো। এরপর নিহতদের লাশ থানায় হস্তান্তর করা হতো বলে তিনি ট্রাইব্যুনালে জানান।

আব্বাস মল্লিক আরও জানান, এসব অভিযানের পর মাঝিদের খামে করে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। তাঁর সাক্ষ্যে এ ধরনের অভিযানে স্থানীয় নৌযান ও মাঝিদের কীভাবে ব্যবহার করা হতো, সে সম্পর্কেও তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

ট্রাইব্যুনালে নিজের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আব্বাস। তাঁর দাবি, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে র‍্যাবের কথিত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা করার কারণে তিনি র‍্যাবের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বলে আব্বাস জানান।

আব্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন র‍্যাবের পক্ষ থেকে ফোন করে আলকাছকে ‘জিয়া স্যার’ ডেকেছেন বলে জানানো হয়। এরপর আলকাছ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওই দিন সন্ধ্যার পর তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং এরপর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন আব্বাস।

ভাইয়ের সন্ধানে বিভিন্ন র‍্যাব কার্যালয়ে যোগাযোগ করার কথাও জানান তিনি। খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়ে গিয়ে কোনো তথ্য পাননি বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে সেখানে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পুলিশ রাজি হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা জিয়াউল আহসানকে শনাক্ত করেন আব্বাস মল্লিক। একই সঙ্গে নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের বিষয়ে বিচার দাবি করেন তিনি। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

এই সাক্ষ্যকে কেন্দ্র করে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে অভিযোগগুলোর আরও বিস্তারিত যাচাই ও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান, কথিত হত্যাকাণ্ড এবং লাশ গুমের অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষীদের বক্তব্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া হয়নি; মামলাটি বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের রায়ের ওপর নির্ভর করবে।