দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য আবারও খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন ও বনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ায় আবারও সুন্দরবনের নদী, খাল, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য উপভোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দেশের পর্যটন খাতের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিশাল বনভূমি, অসংখ্য নদী ও খাল, কেওড়া-গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এবং বিচিত্র বন্যপ্রাণীর কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে ভিড় করেন। তবে সুন্দরবনের পর্যটন কার্যক্রম অন্যান্য সাধারণ পর্যটন এলাকার মতো নয়। এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় পর্যটকদের প্রবেশ, নৌযান চলাচল, বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়া এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশে মানুষের উপস্থিতি কম ছিল। এর ফলে বনের প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর মানবসৃষ্ট চাপও তুলনামূলকভাবে কমে আসে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বংশবিস্তারের সময় মানুষের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটন বন্ধ রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বনের স্বাভাবিক পরিবেশকে কিছুটা নির্বিঘ্ন রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করা।
নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবন খুলে দেওয়ার খবরে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মধ্যেও নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে নৌযান মালিক, চালক, গাইড, স্থানীয় ব্যবসায়ী, হোটেল ও খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত। পর্যটক যাতায়াত শুরু হলে এসব মানুষের আয়-রোজগারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুন্দরবনে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হলো নৌপথে বন ঘুরে দেখা। নদী ও খালের দুই পাশে ঘন ম্যানগ্রোভ বন, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন এবং প্রকৃতির নীরব পরিবেশ পর্যটকদের বিশেষ অভিজ্ঞতা দেয়। ভাগ্য ভালো হলে পর্যটকরা হরিণ, বানর, কুমিরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা পেতে পারেন। সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে বন্যপ্রাণী দেখার ক্ষেত্রে পর্যটকদের ধৈর্য ও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।
সুন্দরবন আবার খুলে দেওয়ার পর পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে পরিবেশবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা। বনের ভেতরে প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলা, উচ্চ শব্দ করা, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা কিংবা অনুমোদিত এলাকার বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটকদের মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল এবং উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢাল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় পর্যটন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। পর্যটন থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হলেও অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ বনের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত রুট অনুসরণ, অনুমোদিত নৌযান ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি।
নিষেধাজ্ঞার পর সুন্দরবন খুলে যাওয়ায় ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের কাছে যাওয়ার সুযোগকে অনেকেই স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে সুন্দরবন উপভোগের পাশাপাশি এর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাও প্রত্যেক পর্যটকের কর্তব্য। একটি প্লাস্টিকের বোতল বা সামান্য শব্দও এই সংবেদনশীল পরিবেশে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আজ থেকে সুন্দরবনের পর্যটন কার্যক্রম আবার শুরু হওয়ায় দেশের পর্যটন খাতে নতুন গতি আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও থাকবে বনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব। পর্যটকদের সচেতনতা, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এর প্রাকৃতিক সম্পদও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার পর সুন্দরবনের দুয়ার আবার খুলেছে। তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। তবে এই বনকে ভালোবাসার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—এর সৌন্দর্য উপভোগ করা, কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটানো।