Loading...

  • 26 Jul, 2026

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ, ফ্রান্সে অতিরিক্ত মৃত্যু প্রায় এক হাজার

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ, ফ্রান্সে অতিরিক্ত মৃত্যু প্রায় এক হাজার

ফ্রান্সে কয়েকদিন ধরে অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে অবস্থান করলেও রোববার কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ইউরোপজুড়ে চলমান ভয়াবহ তাপপ্রবাহ জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশে ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবহন ও জ্বালানি খাতে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ফ্রান্সে, যেখানে চলতি তাপপ্রবাহের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা পাবলিক হেলথ ফ্রান্স জানায়, ২৪ জুন থেকে শুরু হওয়া তীব্র গরমের মধ্যে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। মৃতদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি থাকা অঞ্চলগুলো, বিশেষ করে রাজধানী প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস এলাকায়।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তীব্র গরমে একাকী ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বয়স্ক মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, বর্তমানে প্রকাশিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎস এলাকায় শনিবার ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড। ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভা ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাতের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান তাপপ্রবাহের পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। তাদের মতে, এমন তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী গরম অতীতে খুবই বিরল ছিল। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকার ঘটনা এখন দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে।

জার্মানির গ্রিন পার্টির সাবেক সংসদীয় নেতা ক্যাটরিন গ্যোরিং-একহার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “এটি আর সাধারণ গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।”

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জার্মানিতে দেশব্যাপী তাপমাত্রা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হাঙ্গেরিতে অতিরিক্ত উষ্ণ পানির কারণে পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর একটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে বেজনাউ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

ইতালির পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স এবং বোলোনিয়া-সহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। দেশটির প্রধান নদী পো নদী-তে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে, যা কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে।

অতিরিক্ত গরমের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সড়ক ও রেল যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে। জার্মানির একটি ব্যস্ত মহাসড়কে তাপের কারণে ফাটল দেখা দেওয়ায় আংশিকভাবে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে ডয়চে বান দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট পরিবর্তনের বিশেষ সুযোগ দিয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন দেশে বড় জনসমাগম ও ক্রীড়া আয়োজনের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে প্রাইড শোভাযাত্রায় অতিরিক্ত পানি সরবরাহ ও জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতালির মিলানে প্রাইড মিছিলের সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিযোগিতার দূরত্ব কমিয়ে আনা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’র আকৃতির একটি উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ ইউরোপের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে গরম বাতাস আটকে রেখেছে। এর ফলে স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। তবে সপ্তাহের শেষভাগে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাপপ্রবাহের তীব্রতা কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।