ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম তদারকি এবং সংসদীয় নজরদারি জোরদারের লক্ষ্যে আরও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে এসব কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম কমিটিগুলো গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
নতুন গঠিত কমিটিগুলোর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন রকিবুল ইসলাম। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে।
এ ছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন কলিম উদ্দিন আহমেদ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব পেয়েছেন মো. আমানউল্লাহ আমান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন আলহাজ মোহাম্মদ জি কে গউছ। ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নাসের রহমানকে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন রফিকুল ইসলাম জামাল এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সেলিমা রহমানকে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা, ব্যয় ও নীতিমালা নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নতুন করে ১০টি কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তদারকি কাঠামো আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন কমিটিগুলোর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে কৃষিমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদসহ আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য সদস্য হিসেবে রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ একাধিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। একইভাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে রাখা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাটসহ বিভিন্ন সংসদ সদস্য রয়েছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে মন্ত্রী আন্দালিব রহমান, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ অন্যান্য সদস্য রয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ একাধিক সংসদ সদস্যকে সদস্য করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নাসের রহমানের সঙ্গে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুসহ সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জামালের সঙ্গে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)সহ অন্য সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি সেলিমা রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ সদস্যরা রয়েছেন।
এদিকে নতুন ১০টি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংসদে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, নতুন গঠিত কোনো কমিটির সভাপতির দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে অধিবেশনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং একপর্যায়ে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। তবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সম্পর্কিত কমিটি। নতুন ১০টি কমিটি গঠনের আগে মোট ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৯টি ছিল মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত। ফলে সর্বশেষ গঠিত কমিটিগুলোর মাধ্যমে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে গেল।
সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের কথা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার আগে বর্তমান কাঠামোতেই কমিটিগুলো গঠন করা হচ্ছে বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটিগুলো এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে সংসদীয় সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে। বিশেষ করে কৃষি, শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ, বিমান ও পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য ও সম্প্রচার, পরিবেশ, ভূমি, ধর্ম এবং নারী ও শিশু উন্নয়ন—এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর কার্যক্রমে সংসদীয় নজরদারি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে সরকারি কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানো, নীতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংসদে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কমিটিগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে কার্যকর সংসদীয় নজরদারি ও গঠনমূলক আলোচনার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে।
সূত্র: সংসদ অধিবেশন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।