Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

নেপালের ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৬২৩, নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি

নেপালের ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৬২৩, নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এখনো দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। শনিবার (২৯ আগস্ট) পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন নদীর ভাটি অঞ্চল থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও মরদেহ ভেসে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্গত অঞ্চলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে চিতওয়ান ও পূর্ব নওয়ালপরাসি এলাকায়। চিতওয়ানে ২৩৩টি এবং পূর্ব নওয়ালপরাসিতে ১৫৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে বহু মানুষ ভেসে যাওয়ায় নদীর নিম্নাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে।

হিমালয় থেকে উৎপন্ন ভোটেকোশী ও ত্রিশূলি নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতে মানুষ ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। এসব নদীতে ভেসে যাওয়া বেশ কয়েকজনের মরদেহ গোর্খা, ধাদিং ও নুয়াকোট অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক মরদেহ নেপালের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ভেসে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে উদ্ধার কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

নেপাল অংশে মোট ৬৩৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১১ জন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সীমান্তসংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে আরও ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে পুরো দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে।

দুর্যোগের পর থেকে নেপাল সরকার ব্যাপক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩০১ জন মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা আহত অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ও আহতদের বড় একটি অংশ নুয়াকোট ও রসুয়া জেলার বাসিন্দা। দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

নেপালের কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বর্তমানে ৪ হাজার ৮১১ জন পুলিশ সদস্য উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ, নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তারা কাজ করছেন। তবে উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২৭ জন পুলিশ সদস্য এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশি তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রবল বর্ষণ, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং ভূমিধসের কারণে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক সড়ক ও সেতু পানির স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভূমিধসের কারণে পাহাড়ি সড়ক বন্ধ রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।

বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকায় নিরাপদ পানি, খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি আশ্রয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন এবং উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করে নিখোঁজদের সন্ধানের দাবি জানাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ঘেঁষা নেপালের নদীগুলোতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব দ্রুত পড়ে। নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এবারের দুর্যোগেও একাধিক নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছানোর ঘটনাও উদ্ধার কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে।

নেপাল পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থার সদস্যরা দুর্গত এলাকায় কাজ করছেন। নিখোঁজদের সন্ধানে নদীর তীরবর্তী এলাকা, সেতুর নিচের অংশ এবং ভাটির বিভিন্ন স্থানেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভয়াবহ এই বন্যা ও ভূমিধস নেপালের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় মানবিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। শত শত মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি দুর্গত মানুষদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।