Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহে পাকিস্তানের সাড়া, ভারতের নজর

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহে পাকিস্তানের সাড়া, ভারতের নজর

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যুক্ত হওয়ার আগ্রহ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেলে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে—পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এমন বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান ও ভারত। পাকিস্তান বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ভারত জানিয়েছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন আঞ্চলিক সব পরিস্থিতির ওপর তারা নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।

জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তিনি চুক্তিটিকে ‘ইসলামি পরিবারের’ অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দেবে কি না, সেটি সম্পূর্ণভাবে দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ অন্য কোনো দেশের জন্য অস্বস্তির কারণ হওয়ার কথা নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের দুই শীর্ষ কূটনীতিকের বক্তব্যের পরই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

ভারতের অবস্থান জানতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন তোলেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র সাংবাদিক কল্লোল ভট্টাচার্য। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান উভয়েই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে নিজেদের সিদ্ধান্ত এবং ইসলামি পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখেছেন। এ বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান কী—তা জানতে চান তিনি।

জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব বিষয়ের ওপর তারা সার্বক্ষণিক নজর রাখে। দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি। যদিও বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে সরাসরি কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেননি ভারতীয় মুখপাত্র, তার বক্তব্যে বিষয়টি নয়াদিল্লির নজরদারির মধ্যে রয়েছে বলে স্পষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ যদি এই নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে পাকিস্তান বিষয়টি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা করবে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্য দুই অংশীদার হিসেবে সৌদি আরব ও তুরস্কের মতামতও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।

পাকিস্তানি মুখপাত্র চুক্তিটিকে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ভবিষ্যতে এটি একটি বিকাশমান নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যৌথ দায়িত্বের প্রতি সমান অঙ্গীকার রয়েছে—এমন দেশগুলোকে এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

তবে তাহির আন্দ্রাবি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এর কাঠামো, সদস্যপদ এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত কোনো ধারণা দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটি ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করে। ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো নতুন কোনো কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, সেটি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদিও নয়াদিল্লি এখনো সরাসরি কোনো বিরোধিতার কথা বলেনি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বিষয়টি তারা জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে পাকিস্তান আগ্রহটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।

এদিকে একই সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের রংপুরে এক শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের আলোচনা শুধু তিন বা চারটি দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রস্তাব পেলে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে এ বিষয়ে কী ধরনের আলোচনা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে ভারতের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়াও ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।