ইসরায়েলের বর্তমান সরকার মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করতে নানা ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও নিজেদের অধিকার রক্ষায় মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ইস্তাম্বুলে মহানবী (সা.)-এর জন্মস্মরণে আয়োজিত মাওলিদ আল-নবী সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন এরদোয়ান।
এরদোয়ান বলেন, ইসরায়েলের ‘যুদ্ধকামী’ সরকার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শুরু করে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উসকানি চালিয়ে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, ইসরায়েলের নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং ঐক্য জোরদার করা প্রয়োজন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, মুসলিমদের নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এরদোয়ান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য কমিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা, সংহতি ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে। তিনি বলেন, মুসলিমদের শক্তিশালী হতে হবে এবং নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ সম্মিলিতভাবে রক্ষা করতে হবে।
ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে এরদোয়ান ‘জায়নবাদ’কে প্রতিবেশী দেশগুলোর শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার পক্ষে যারা অবস্থান নিচ্ছেন, তারাও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতিরও সমালোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তার অভিযোগ, ইসরায়েলের নীতির কারণে বেসামরিক মানুষের ওপর যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
এরদোয়ানের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে। একই সময়ে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এরদোয়ান এর আগে এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের হাতে নেওয়ার ধারণাটিও গুরুত্ব পেয়েছে। এরদোয়ান মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সমাধান বাইরের কোনো শক্তির চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোর মাধ্যমে না হয়ে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে হওয়া উচিত। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, নিজেদের মধ্যে বিভাজন থাকলে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা এবং নিজেদের অধিকার রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
এরদোয়ান বলেন, মুসলিমদের শক্তিশালী হতে হবে এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় একযোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার দায়িত্বও নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে একটি দেয়ালের ইটের মতো পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।
তার বক্তব্যে গাজা ও ফিলিস্তিনের মানবিক পরিস্থিতিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি লেবাননের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এরদোয়ান। তার বক্তব্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও নিরাপত্তাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গাজা ও ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন। সর্বশেষ বক্তব্যে তিনি মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে নিজেদের অধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক মতপার্থক্য কমিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মুসলিম দেশগুলোর সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।