Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

হিমালয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ, নেপাল-তিব্বতে প্রাণহানি ছাড়াল হাজার

হিমালয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ, নেপাল-তিব্বতে প্রাণহানি ছাড়াল হাজার

নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯৮৭ জন এবং তিব্বতে ১৬ জন মারা গেছেন। একই সঙ্গে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৪৬২ জন। ফলে উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ভূমিধসের সূত্রপাত হয়। প্রবল স্রোতে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ঢল নেমে আসে পাহাড়ি নদীগুলোতে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়ে আশপাশের জনবসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগের ভয়াবহতা আরও বেশি হওয়ায় অনেক জায়গায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেও সময় লেগেছে।

নেপালেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেখানে ৯৮৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এখনো ৩ হাজার ৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৬২ জনে।

নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০টি দেশের ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের অনেকেই হিমালয় অঞ্চলে ভ্রমণ, তীর্থযাত্রা কিংবা পর্যটনের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। ফলে এই দুর্যোগের প্রভাব শুধু নেপাল ও তিব্বতের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন দেশের পরিবারও তাদের স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। অনেক সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থলপথে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে উদ্ধারকারীদের কাজ আরও জটিল হয়েছে। তবে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুর্যোগের কারণে বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোতে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো গ্রাম পানির স্রোত ও কাদায় ঢেকে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকারীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে নদীতে ভেসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে।

এই দুর্যোগে মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক মরদেহ দ্রুত শনাক্ত ও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পরিচয় নিশ্চিত হলে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দ্রুত হিমবাহ গলার প্রবণতা ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। হিমবাহ ধসের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে এলে পাহাড়ি নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

এদিকে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই ধ্বংসযজ্ঞের নতুন চিত্র সামনে আসছে। প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছাতে পারায় কিছু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা শেষ আশায় উদ্ধারকারী দলের দিকে তাকিয়ে আছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

নেপাল ও তিব্বতের এই ভয়াবহ দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঝুঁকির ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। একদিকে চলছে নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় পুরো অঞ্চলজুড়ে গভীর শোক নেমে এসেছে। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম এলাকা থেকে আরও মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা এবং নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে।