যথাযথ পরীক্ষাগার ও ফরেনসিক অবকাঠামোর অভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ করা মাদকদ্রব্যের সঠিক পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Salahuddin Ahmed। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জব্দ করা হেরোইনও শেষ পর্যন্ত ‘আটা-ময়দা হয়ে যাওয়ার’ মতো অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর Osmani Memorial Auditorium-এ ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে জব্দ করা আলামত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বস্তু জব্দ করেছে, তা প্রকৃতপক্ষে হেরোইন, অন্য কোনো মাদক নাকি সাধারণ পাউডারজাতীয় পদার্থ—তা দ্রুত নিশ্চিত করা যায় না।
তিনি বলেন, “যথাসময়ে পরীক্ষার সুযোগ না থাকলে নানা ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। এজন্য দেশের প্রতিটি জেলায় আধুনিক মাদক পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।”
মাদক মামলার বিচারিক জট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, শুধু ঢাকাতেই বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একজন বিচারকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় মামলার শুনানি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে মাদক মামলাগুলো নির্ধারিত আদালতে বিচারাধীন থাকলেও সরকার নতুন সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুযোগ রাখা হবে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় অনেক কর্মকর্তা ঝুঁকির মুখে পড়েন এবং কখনো কখনো সশস্ত্র হামলার শিকারও হন। তাদের সুরক্ষা ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, খুব শিগগিরই সংসদে নতুন আইন উত্থাপন করা হবে। আইন পাস হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদের ৯ এমএম পিস্তলসহ আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করা হবে, যাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এ সময় মাদক শনাক্তকরণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াডের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। বর্তমানে সীমিত পরিসরে এ সুবিধা থাকলেও নতুন আইনের মাধ্যমে Department of Narcotics Control-এর নিজস্ব ডগ স্কোয়াড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় দেশের অনেক আইন যুগোপযোগী নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অপরাধ দমনে এখনো ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি জানান, সাইবার অপরাধ, অনলাইন আর্থিক প্রতারণা, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ জব্দের বিষয়ে নতুন আইনি সংস্কার নিয়ে কাজ চলছে। এসব অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তি ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে যে দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় কিটামিনসহ তরল মাদককে পাউডার আকারে রূপান্তরের জন্য অবৈধ ল্যাবরেটরি পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রম বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন আধুনিকায়নের কাজ চলছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।