চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ডেনমার্কের সহযোগিতায় নির্মিতব্য লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর আগামীকাল রোববার (৩০ আগস্ট) স্থাপন করা হবে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া প্রজেক্ট সাইটে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার বেলা ১১টায় পতেঙ্গার লালদিয়া প্রজেক্ট সাইটে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের বড় একটি অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতি বছর বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চাপও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণে বন্দরের অবকাঠামো ও সক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছে। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ সেই প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালকে একটি আধুনিক বন্দর সুবিধা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে সরকার। বর্তমানে বন্দরে যে পরিমাণ কনটেইনার পরিচালনা করা হয়, ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়লে অতিরিক্ত সক্ষমতার প্রয়োজন হবে। নতুন টার্মিনাল সেই বাড়তি চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। এর ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন ধাপে সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ডেনমার্কের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে টার্মিনালটি নির্মাণ করা হলে দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বন্দরসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের লজিস্টিকস খাতেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আমদানি করা কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, ভোগ্যপণ্য এবং রপ্তানিপণ্য দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে পরিবহন করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে সময় কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়তে পারে। তাই নতুন কনটেইনার টার্মিনাল শুধু বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প নয়, বরং সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দরের সামগ্রিক অপারেশনাল ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে। দ্রুত পণ্য খালাস ও সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমতে পারে। এর ফলে দেশের সরবরাহব্যবস্থা ও লজিস্টিকস খাত আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দেশের বন্দর ও নৌপরিবহন অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতিও নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্য বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। তাই বন্দর ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন দ্রুত করার উদ্যোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হওয়াকে চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি যথাসময়ে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
রোববারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির নির্মাণপর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। সরকারের প্রত্যাশা, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে।