Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে ঝুঁকি, বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি

ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে ঝুঁকি, বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো থেকে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের শেষ প্রান্তিকে পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন নীতিগত ব্যবস্থার কারণে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে জমে থাকা দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতার প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ আটকে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য, মূলধন ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে আসার অন্যতম কারণ হিসেবে বড় পরিসরে ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সুবিধার আওতায় বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল করায় অনেক ঋণ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তবে এই পতনকে ব্যাংক খাতের মৌলিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কোনো ঋণ সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখানো গেলেও ঋণগ্রহীতা প্রকৃতপক্ষে অর্থ পরিশোধে সক্ষম কি না, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিতভাবে ঋণ আদায় না হলে ভবিষ্যতে এসব ঋণ আবারও খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নির্ণয় এবং আদায়যোগ্য ঋণ দ্রুত আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতিকেও দুর্বল করে তুলছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশ কয়েকটি ব্যাংক সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না।

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতিও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঋণের একটি অংশ সময়মতো আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে ঋণখেলাপি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু ঋণ পরিশোধে সক্ষম ও আগ্রহী গ্রাহকদের জন্য পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল এবং বিশেষ এক্সিট সুবিধার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণ আদায়ে বিশেষ এক্সিট সুবিধা চালু করে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু পুনঃতফসিল বা নতুন করে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংক খাতের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। ঋণের প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি। এই খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা কমে যায়। এর প্রভাব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে। তাই খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, ঋণ আদায়ে কঠোরতা এবং ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকাতে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের হার কমলেও ব্যাংকিং খাতের মূল সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।