বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের সবচেয়ে আলোচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এ বছর মাঠে না গড়ালেও ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য নতুন আয়োজন নিয়ে হাজির হচ্ছে বিসিবি। জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) টি-টোয়েন্টিকে নতুন নাম ও নতুন কাঠামোয় সাজিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নামে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে দেশের বিভিন্ন ভেন্যুতে এই প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিসিবির এই উদ্যোগকে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো শক্তিশালী করার একটি নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাউন্টি ক্রিকেটে একটি অঞ্চলের সঙ্গে একটি দলের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হয় এবং দল পরিচালনা, খেলোয়াড় উন্নয়ন ও স্থানীয় ক্রিকেট অবকাঠামোর সঙ্গে ক্লাবের সম্পৃক্ততা থাকে। বাংলাদেশের নতুন পরিকল্পনাতেও সেই ধরনের একটি কাঠামো তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে। এর ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, বরং আঞ্চলিক ক্রিকেটের সঙ্গে দল ও ফ্র্যাঞ্চাইজির দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিসিবির পরিকল্পনায় ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে শুধু টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ঘরোয়া ক্রিকেটের আরও কয়েকটি প্রতিযোগিতার সঙ্গে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার দিনের সংস্করণকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট ফোর-ডে’ এবং ওয়ানডে সংস্করণকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট ওয়ান-ডে’ নামে আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও আগে জানানো হয়েছে। একই কাঠামোর আওতায় এনসিএল টি-টোয়েন্টি নতুন নামে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট টি-টোয়েন্টি’ হিসেবে পরিচিত হবে।
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রিকেটের অবকাঠামো ও কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় করা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি ভেন্যু ও শহরকেন্দ্রিক হয়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ আয়োজন করা গেলে স্থানীয় দর্শকদের সঙ্গে দলের সম্পর্ক বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটারদের সামনে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগও বাড়বে।
নতুন এই টুর্নামেন্ট তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় দলের বাইরে থাকা কিংবা জাতীয় ক্রিকেট লিগে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়া প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ঘরোয়া পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজরে আসার পথ আরও সুগম হতে পারে। বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ঢাকা প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার নিয়মিত এনসিএলে সুযোগ পান না; নতুন কাঠামোর প্রতিযোগিতা তাদের জন্য পরবর্তী ধাপে ওঠার সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ আয়োজনের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজি বা মালিকানার বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে। বিসিবি তিনটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতাকে মালিকানা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। ছয়টি দলের মালিকানা দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এবং আগ্রহ যাচাইয়ের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বোর্ডের দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এখানে কাউন্টি ক্রিকেটের ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে দলগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট অঞ্চল, স্থানীয় ক্রিকেট কাঠামো এবং খেলোয়াড় উন্নয়নের একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পরিচর্যা, মাঠের ব্যবহার, কোচিং ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক ক্রিকেটের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক কাঠামো আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
এদিকে চলতি বছর বিপিএল আয়োজন না করার সিদ্ধান্তও এই নতুন উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বিসিবি জানিয়েছে, এক বছর বিরতি দিয়ে বিপিএলকে আরও গোছানো ও পরিকল্পিতভাবে আয়োজন করতে চায় তারা। ফলে বিপিএলের অনুপস্থিতিতে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে নতুন এই প্রতিযোগিতার সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। শুধু নাম পরিবর্তন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি যুক্ত করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত প্রতিযোগিতা, ভালো মানের মাঠ, প্রশিক্ষণ সুবিধা, দক্ষ কোচিং, খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ এবং দর্শকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব ও আঞ্চলিক ক্রিকেট উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
বিসিবির পক্ষ থেকে এখনো টুর্নামেন্টটির চূড়ান্ত সূচি ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগ দ্রুতই বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে টুর্নামেন্টটি কবে মাঠে গড়াবে, কয়টি দল অংশ নেবে, কোন কোন ভেন্যুতে ম্যাচ হবে এবং মালিকানা কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে পরবর্তী ঘোষণায়।
সব মিলিয়ে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শুধু একটি নতুন টুর্নামেন্টের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটকে নতুন কাঠামোয় সাজানোর একটি বড় পরিকল্পনা হিসেবে সামনে এসেছে। কাউন্টি ক্রিকেটের আদলে আঞ্চলিক ভিত্তি, বেসরকারি মালিকানার সম্পৃক্ততা এবং তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ—এই তিনটি বিষয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে। এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের অপেক্ষা, বিসিবির নতুন এই পরিকল্পনা মাঠে কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।