Loading...

  • 09 Sep, 2026
সর্বশেষ

অ্যান্টিভেনমের ৩ লাখ টাকার বিতর্ক: অর্থের একাংশ ফেরত দিলেন সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

অ্যান্টিভেনমের ৩ লাখ টাকার বিতর্ক: অর্থের একাংশ ফেরত দিলেন সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভেনম কেনার বরাদ্দ করা অর্থ নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নতুন মোড় নিয়েছে। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ ফেরত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে মোট কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং বাকি অর্থের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ থেকে সাপে কাটা রোগীদের জন্য অ্যান্টিভেনম কেনার উদ্দেশ্যে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের নামে ওই অর্থের চেক ইস্যু করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে হাসপাতালের নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে বরাদ্দের অর্থ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনিক পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়।

অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা অর্থটি মূলত সাপে কাটা রোগীদের জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। নদী ও চরাঞ্চলঘেরা মতলব উত্তর উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বাড়ে এবং প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পর চেকটি তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের নামে দেওয়া হয়। নথিতে অ্যান্টিভেনম কেনার একটি রশিদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাসপাতালের অর্থনৈতিক হিসাব ও স্টক-সংক্রান্ত নথি নিয়ে পরবর্তীতে অসঙ্গতি দেখা দেয়। এ কারণেই বরাদ্দ করা অর্থের প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দাবি, উপজেলা পরিষদের বরাদ্দ করা ৩ লাখ টাকা দিয়ে কোনো অ্যান্টিভেনম কেনা হয়নি এবং সেই অর্থ হাসপাতালের ব্যাংক হিসাবেও জমা হয়নি। অন্যদিকে, আরেক প্রতিবেদনে হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, তৎকালীন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকে অর্থ নিয়ে ৩০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম কেনা হয়েছিল এবং সেই কেনাকাটার হিসাব অফিসিয়াল রেকর্ডে রয়েছে। ফলে অর্থের প্রকৃত ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মাহমুদা কুলসুম মনি জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। যথাযথ জবাব না পাওয়ায় আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এদিকে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার ঘটনা তদন্ত প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে শুধু অর্থ ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অ্যান্টিভেনমের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা সরাসরি রোগীদের চিকিৎসাসেবায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বরাদ্দের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

অ্যান্টিভেনম না থাকলে বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা এবং জরুরি সময়ে তা রোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মতলব উত্তরের মতো সাপের উপদ্রবপ্রবণ এলাকায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি।

এ ঘটনায় সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে পুরো বরাদ্দের অর্থের হিসাব এবং অ্যান্টিভেনম কেনার প্রকৃত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। তদন্ত শেষ হলে বরাদ্দকৃত ৩ লাখ টাকার পুরো অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন নজর রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে বরাদ্দ, ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: দেশ রূপান্তর, মানবকণ্ঠ ও স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদন।