দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকার সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়; বরং আগের সরকারের আমদানি-নির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতির কারণেই দেশে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে কুমিল্লা টাউন হলে ঢাকা-কুমিল্লা বিকল্প মহাসড়ক এবং কোটবাড়ি এএইচকে (আখতার হামিদ খান) স্যাটেলাইট সিটির ধারণাপত্র উপস্থাপনবিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নিজস্ব গ্যাসের ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। তবে বিদ্যমান সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। অতীতে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দামের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিতেও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানির দামও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। এতে একদিকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মধ্যমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির মজুত গড়ে তোলার বিষয়েও সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে দেশের যেসব এলাকায় গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখান থেকে কীভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা যায়, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বিশেষভাবে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভোলায় ইতোমধ্যে যে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা কীভাবে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সাকি বলেন, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। যারা আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন এবং যারা এখনো শারীরিক ক্ষত নিয়ে জীবনযাপন করছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায় রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই গণতান্ত্রিকভাবে দেশের উন্নয়নকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেমিনারে ঢাকা-কুমিল্লা বিকল্প মহাসড়কের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা করা হয়। মূল ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে একটি বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণ এখন অত্যন্ত জরুরি। এই সড়ক বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান মহাসড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি কুমিল্লার উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
মনিরুল হক চৌধুরীর মতে, প্রস্তাবিত বিকল্প মহাসড়কটি নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত কুমিল্লার উত্তরাঞ্চলে কৃষি ও শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ বাড়বে। ফলে এ প্রকল্প শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবুর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ, কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আমিরুজ্জামান আমির।
সেমিনারে আলোচনার মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে। একদিকে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং অন্যদিকে বিকল্প যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি করা হলে দেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হতে পারে। সরকারের মধ্যমেয়াদি জ্বালানি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশাই জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।