কিশোরগঞ্জের ভৈরবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা আল আমিনকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রোববার (২৩ আগস্ট) দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভৈরব পৌর শহরের টিনপট্টি এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে রাত ৩টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আল আমিন ভৈরব পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ভৈরব পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ভৈরব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভৈরব বাজারে তার মালিকানাধীন ‘রিভারভিউ’ নামে একটি আবাসিক হোটেলও রয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আল আমিন ভৈরব পৌর শহরের আড়াইবেপারী এলাকার জসিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় তিনি দুই দফায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামিনে ছিলেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আল আমিন অনেকটা আড়ালে জীবনযাপন করতেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে তিনি পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করতেন না। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভৈরব শহরের রানীবাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
ঘটনার দিন রাতে আল আমিন তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রিভারভিউ হোটেলে ছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। পরে রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে হোটেল থেকে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। বাসার সড়কে ঢুকে কিছুদূর যাওয়ার পর একদল দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে ধরে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে। এরপর তারা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে পালিয়ে যায়।
হামলায় আল আমিনের মাথায় একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তার একটি পায়ের রগও কেটে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। স্থানীয় লোকজন তাকে সড়ক থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে দ্রুত চিকিৎসার জন্য তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাত ৩টার দিকে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আল আমিনকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গুরুতর আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আল আমিন যে সড়ক দিয়ে রাতে বাসায় ফিরতেন, সেটি সাধারণত অনেকটা নির্জন থাকে। হামলার সময় চিৎকার শুনে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা কয়েকজনকে সেখান থেকে চলে যেতে দেখেছেন বলে জানান। পরে সড়কের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় আল আমিনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মাথা ও মুখে ব্যাপক রক্ত থাকায় প্রথমে তাকে শনাক্ত করতেও স্থানীয়দের বেগ পেতে হয়।
নিহতের স্ত্রী তানিয়া খানম জানান, রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে স্বামীর সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন আল আমিন তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি হোটেলে রয়েছেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে বাসায় ফিরবেন। একই সঙ্গে রাতের খাবার প্রস্তুত রাখতে বলেছিলেন। এরপর আর তার সঙ্গে কথা হয়নি। কারা বা কী কারণে তার স্বামীকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ধারণা করতে পারছেন না বলে জানান।
আল আমিনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়, পূর্বের মামলা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হত্যার প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহাবুর রহমান আল আমিন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ঘটনার তদন্তের পর হত্যার কারণ ও হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।