বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের আমানত ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আবিবা, ফারিস্ট, এফএস ফাইনান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ইতোমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য চলতি সপ্তাহেই একটি পূর্ণাঙ্গ স্কিম চূড়ান্ত করে ঘোষণা করা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় তহবিল ছাড় হওয়ার পর ধাপে ধাপে গ্রাহকদের অর্থ তাদের ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নতুন স্কিম তৈরি করা হবে। তবে এটি আগের স্কিমের হুবহু অনুকরণ হবে না। সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি, আমানতের পরিমাণ এবং সম্পদের অবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনা করে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তিগত আমানতকারীর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে, তারা তাদের পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৯০ শতাংশ অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ লাখ টাকা আমানতকারীরা প্রথম ধাপে ৮৫ শতাংশ অর্থ পেতে পারেন। আমানতের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম ধাপে ফেরত দেওয়ার অর্থের হারও কমতে থাকবে।
তবে এসব অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রস্তাবিত স্কিমে বিস্তারিত সময়সীমা উল্লেখ থাকবে। কোন শ্রেণির আমানতকারী কত টাকা বা কত শতাংশ অর্থ প্রথম ধাপে পাবেন, কারা পূর্ণ অর্থ পাবেন এবং যারা আংশিক অর্থ পাবেন তাদের অবশিষ্ট অর্থ কখন ও কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয় পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় উল্লেখ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ মূলত সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি বলেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অদক্ষ ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করে আর্থিক খাতকে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে আনা প্রয়োজন। তার মতে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে না রেখে সুশৃঙ্খলভাবে অবসায়ন করাও জরুরি।
অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অবসায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও অন্যান্য আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন স্কিম চূড়ান্ত হলে চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত আমানতকারীরা কত টাকা ও কোন সময়ের মধ্যে ফেরত পাবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে। তবে সরকারের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং অবসায়ন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর পুরো কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।