Loading...

  • 10 Jun, 2026

স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত: লাখো নারী কেমোথেরাপি ছাড়াই পেতে পারেন কার্যকর চিকিৎসা

স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত: লাখো নারী কেমোথেরাপি ছাড়াই পেতে পারেন কার্যকর চিকিৎসা

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের জিনগত বা জেনোমিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে কোন রোগীর কেমোথেরাপি প্রয়োজন এবং কার প্রয়োজন নেই। ফলে ভবিষ্যতে লাখো নারী কেমোথেরাপির কষ্টকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের University College London (ইউসিএল)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক গবেষণা ‘অপটিমা’ (OPTIMA) এই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। গবেষণায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি স্তন ক্যান্সার রোগী অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৪০ বছরের বেশি।

গবেষণায় মূলত হরমোন-সংবেদনশীল স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষকরা দেখতে পান, যেসব রোগীর টিউমারের জিনগত ঝুঁকির মাত্রা কম, তারা কেমোথেরাপি ছাড়াই শুধুমাত্র হরমোন থেরাপির মাধ্যমে সফলভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন। এতে রোগীদের সুস্থতার হার প্রায় একই থাকে, কিন্তু কেমোথেরাপির নানা জটিলতা থেকে তারা মুক্ত থাকতে পারেন।

গবেষণায় ব্যবহৃত ‘প্রোসিগনা’ (Prosigna) নামের পরীক্ষাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে টিউমারের ৫০টি জিনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়। জিনগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কতটা, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন রোগীর কেমোথেরাপি প্রয়োজন হবে কি না।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী রোগীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষকে কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই রোগীরা শুধুমাত্র হরমোন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও আশাব্যঞ্জক ছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, যেসব রোগীর জিনগত ঝুঁকির স্কোর কম ছিল এবং যারা কেমোথেরাপি নেননি, তাদের মধ্যে পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে কেমোথেরাপি দীর্ঘদিন ধরে স্তন ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে সাধারণত কেমোথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এর উপকারিতা সীমিত হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কষ্টদায়ক হতে পারে।

কেমোথেরাপির কারণে রোগীরা প্রায়ই চরম ক্লান্তি, বমিভাব, চুল পড়ে যাওয়া, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং প্রজননসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হন। ফলে অপ্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইউসিএলের হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (NHS)-এর আওতাধীন ৫ হাজারের বেশি রোগী প্রতিবছর এই পরীক্ষার মাধ্যমে কেমোথেরাপি এড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন।

কার্ডিফের বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী রোগী কারেন বনহ্যাম এই গবেষণার অন্যতম ইতিবাচক উদাহরণ। প্রোসিগনা পরীক্ষার ফলাফলের কারণে তিনি কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা নিতে সক্ষম হন। গত আট বছর ধরে তিনি রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি গ্রহণ করছেন এবং সুস্থ জীবনযাপন করছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কারেন বলেন, ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার মুহূর্ত এবং চিকিৎসা শুরু করার সময় মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কেমোথেরাপি ছাড়াই কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া তাঁর কাছে বড় স্বস্তির বিষয় ছিল।

গবেষণার প্রধান এবং ইউসিএল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রোব স্টেইন বলেন, এই গবেষণা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। শুধু রোগের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নয়, টিউমারের জৈবিক ও জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে একই ফলাফল প্রযোজ্য কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে জেনোমিক প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন হলে ক্যান্সার চিকিৎসা আরও নির্ভুল, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত হয়ে উঠবে। আর এই গবেষণা সেই সম্ভাবনার দিকেই গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

# ট্যাগ:

স্তন ক্যান্সার, কেমোথেরাপি, জেনোমিক পরীক্ষা, প্রোসিগনা, ক্যান্সার চিকিৎসা, University College London, ইউসিএল, হরমোন থেরাপি, ক্যান্সার গবেষণা, স্বাস্থ্য সংবাদ, চিকিৎসা বিজ্ঞান, নারী স্বাস্থ্য, ক্যান্সার প্রতিরোধ, চিকিৎসা প্রযুক্তি, NHS

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy