দেশের প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত শিক্ষক কামরুদ্দীন আবসার আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর শনিবার (৩১ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর বিআইএসএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহল এবং গণসংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কামরুদ্দীন আবসার দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০১১ সালে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাসায় থেকেই চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছিল। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হলে গত ১৪ মে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
কামরুদ্দীন আবসারের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে শোকের আবহ বিরাজ করছে। তিনি স্ত্রী কবি ফেরদৌসী বেগম এবং একমাত্র সন্তান আদনান মুকিতকে রেখে গেছেন। আদনান মুকিত শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা ‘কিশোর আলো’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ করে দিতে সোমবার সকালে তাঁর মরদেহ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা থাকবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন কামরুদ্দীন আবসার। তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পীই নন, বরং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি প্রগতিশীল লেখক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’-এর সক্রিয় সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন।
গণসংগীতভিত্তিক সংগঠন ‘সৃজন’-এর সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পৃক্ততা ছিল। দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি এবং শোষণবিরোধী সংগ্রামে তিনি গানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কণ্ঠ, সুর ও সংগীতচর্চা বহু আন্দোলনকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
বিশেষ করে ২০০৬ সালের ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী কয়লাখনি রক্ষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের সময় তিনি সাংস্কৃতিক ফ্রন্টকে সক্রিয় করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক গান ‘বলো জয় জাগ্রত বীর জনগণ, হঠাও সাম্রাজ্যবাদ...’-এর সুরকার ছিলেন কামরুদ্দীন আবসার। গানটি পরবর্তীতে গণআন্দোলনের প্রতীকী সংগীতে পরিণত হয়।
গণসংগীতের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও অসংখ্য ছড়া ও গানে সুরারোপ করেছেন তিনি। প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান পরিবেশনের মাধ্যমেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গণসংগীতের চর্চা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশের অনেক পরিচিত শিল্পী তাঁর কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি বই প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন কামরুদ্দীন আবসার। ‘দীপ্র’ নামে তাঁর একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল, যার মাধ্যমে প্রগতিশীল চিন্তা ও সাহিত্যভিত্তিক নানা বই প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বরা। অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, গত শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে তিনি কামরুদ্দীন আবসারকে কাছ থেকে দেখেছেন। বিভিন্ন আন্দোলন, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, কামরুদ্দীন আবসার আজীবন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে সুরের মাধ্যমে শক্তি জুগিয়েছেন এবং অসংখ্য তরুণ শিল্পীর পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।
দেশের গণসংগীত ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে কামরুদ্দীন আবসারের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর গান, সুর, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে বলেই মনে করছেন সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
# ট্যাগ:
কামরুদ্দীন আবসার, গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত শিক্ষক, গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট, বাংলাদেশ লেখক শিবির, ফুলবাড়ী আন্দোলন, গণসংগীত, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, প্রগতিশীল সংস্কৃতি, বাংলাদেশ সংস্কৃতি