পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে এ বছরও আশানুরূপ মূল্য পাননি কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সরকারের নির্ধারিত মূল্য থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক দামে। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল অত্যন্ত কম। ফলে অনেক এলাকায় চামড়া বিক্রি না হওয়ায় তা ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। সাধারণত ঈদের দিন থেকে পরবর্তী দুই থেকে তিন দিন কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও বেচাকেনা চলে। এ বছর সরকার লবণযুক্ত গরুর চামড়ার মূল্য গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির মৌসুমে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অতিরিক্ত ব্যয় থাকলেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সরকার ঘোষিত মূল্য কার্যকর করার জন্য যথাযথ নজরদারি না থাকায় বাজারে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বেড়ে যায়। ফলে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিক্রেতারা।
অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা দাবি করছেন, তাদের পক্ষ থেকে চামড়ার দাম কমানো হয়নি। বরং গত বছরের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে লবণযুক্ত চামড়ার দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের মূল্য প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় এবং রপ্তানি খাতে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে বলে তারা মনে করেন।
রাজধানী ঢাকায় এ বছর প্রায় ৬ লাখ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদের পরবর্তী ১০ দিন ঢাকায় বাইরের এলাকা থেকে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে না পারলেও রাজধানীর ভেতরে সাভারের চামড়াশিল্প নগরী ও পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকায় চামড়া লবণজাত করার কার্যক্রম চলে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রোববার সকাল পর্যন্ত সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে ৫ লাখ ২৯ হাজারের বেশি কাঁচা চামড়া পৌঁছেছে। এছাড়া পোস্তার আড়তগুলোতে আরও প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার চামড়া লবণজাত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মঞ্জুর হাসান জানান, এ বছর পোস্তায় এক লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ না পাওয়া, পর্যাপ্ত জায়গার সংকট এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
সরকার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে মাঝারি আকারের একটি কাঁচা চামড়া রাজধানীতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ছোট চামড়ার দাম ছিল ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং বড় চামড়ার দাম ৭০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রামে বেশিরভাগ চামড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। রাজশাহীতে মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকা। যশোরে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বরিশালে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় চামড়া বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে ছোট আকারের চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাননি আড়তদাররা।
চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে রপ্তানি খাতের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য প্রত্যাশিত দামে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এতে দেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানো, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা গেলে ভবিষ্যতে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যথায় প্রতি বছরই কোরবানির মৌসুমে চামড়ার বাজারে একই ধরনের সংকট ও হতাশা অব্যাহত থাকবে।
ট্যাগ:
কোরবানির চামড়া, ঈদুল আজহা, চামড়া শিল্প, ট্যানারি, কাঁচা চামড়া, সাভার চামড়াশিল্প নগরী, পোস্তা, চামড়ার দাম, বাংলাদেশ অর্থনীতি, চামড়া রপ্তানি, কোরবানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পখাত, ঢাকা, বাংলাদেশ সংবাদ