দীর্ঘ প্রায় তিন মাস অচলাবস্থার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে শুরু করেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) ট্যাংকার। আন্তর্জাতিক শিপিং তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৫ মে) অন্তত দুটি এলএনজি ট্যাংকার সফলভাবে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে একটি পাকিস্তানের দিকে এবং অন্যটি চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। এই ঘটনাকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল।
বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর ফলে শত শত জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে এবং বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বর্তমানে ইরান নির্ধারিত বিশেষ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে সীমিত আকারে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় চলতি মাসে ধীরে ধীরে কয়েকটি তেলবাহী সুপারট্যাংকার ও এলএনজি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ‘ফুওয়াইরিত’ নামের একটি এলএনজি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পাকিস্তানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাহামার পতাকাবাহী এই জাহাজটি গত মার্চ মাসে কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে গ্যাস বোঝাই করেছিল। আগামী মঙ্গলবার পাকিস্তানে এর পণ্য খালাস হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া কাতারএনার্জির আরেকটি বড় এলএনজি ট্যাংকার ‘আল–রাইয়ান’ও সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এই জাহাজটি বর্তমানে প্রণালির বাইরে অবস্থান করছে এবং আগামী জুন মাসে চীনে এলএনজি সরবরাহ করবে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও পাকিস্তানের মতো জ্বালানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় এসব দেশে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে চাপ তৈরি হয়েছিল।
এদিকে অপরিশোধিত তেলবাহী কয়েকটি সুপারট্যাংকারও ধীরে ধীরে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করছে। এর মধ্যে ‘ইগল ভেরোনা’ নামের একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং চীনের নিংবো বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। জাহাজটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করছে বলে জানা গেছে। শিপিং বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের বড় জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সংকেত দিচ্ছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পারস্য উপসাগরের ভেতরে এখনো শত শত জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব জাহাজে থাকা প্রায় ২০ হাজার নাবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ চেইনে চাপ এখনো রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দামের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এতে কিছুটা স্বস্তি পাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
ট্যাগ
হরমুজ প্রণালি, এলএনজি ট্যাংকার, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেল পরিবহন, কাতারএনার্জি, পাকিস্তান, চীন, পারস্য উপসাগর, ইরান, বিশ্ব অর্থনীতি, গ্যাস সংকট, জ্বালানি সরবরাহ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, সুপারট্যাংকার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য