পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে বেড়েছে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত দেখতে এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে অবকাশযাপন করতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন কক্সবাজারে। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই সৈকতজুড়ে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ, আর পর্যটকদের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সমুদ্রপাড়ের পর্যটন শিল্প।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ পরিবার নিয়ে হাঁটছেন বালুচরে, আবার অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখছেন। শিশুদের আনন্দ, তরুণদের উচ্ছ্বাস এবং পরিবারগুলোর অবকাশযাপন সৈকত এলাকায় এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের আগে প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে আগাম বুকিং তুলনামূলক কম ছিল। তবে ঈদের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বর্তমানে হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস ও রিসোর্টগুলোতে সন্তোষজনক হারে বুকিং রয়েছে। অনেক পর্যটক শেষ মুহূর্তে ভ্রমণের পরিকল্পনা করায় পর্যটন খাতে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদের ছুটির অবশিষ্ট দিনগুলোতেও পর্যটকদের এই উপস্থিতি বজায় থাকবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহন খাত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ, লাইফগার্ড এবং স্বেচ্ছাসেবক দল দায়িত্ব পালন করছে। সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা মেনে চলার আহ্বানও জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিপজ্জনক এলাকায় না যাওয়ার জন্য পর্যটকদের নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে।
সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অ্যাডভেঞ্চারের সমন্বয়ে কক্সবাজার এখন শুধুমাত্র সমুদ্রসৈকতনির্ভর গন্তব্য নয়, বরং বহুমাত্রিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
টেকনাফের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এখান থেকে নাফ নদী, মিয়ানমারের পাহাড় এবং দূর থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সম্প্রতি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে এই দ্বীপে ভ্রমণ আরও সহজ হয়েছে।
মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত জাহাজপুরা গর্জন বন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। শতবর্ষী গর্জন গাছ এবং ঘন সবুজ পরিবেশ পর্যটকদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একইভাবে রামুর পাহাড়চূড়ায় গড়ে ওঠা স্বপ্নতরী পার্কও দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
চকরিয়ার নিভৃতে নিসর্গ পার্কে রয়েছে লেক, পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়। এখানে কায়াকিং, নৌভ্রমণ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। এছাড়া ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে মুক্ত পরিবেশে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ থাকায় পরিবার ও শিশুদের কাছে এটি অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও কক্সবাজার সমৃদ্ধ। রামুর বৌদ্ধ বিহার এলাকায় রয়েছে বিশাল গৌতম বুদ্ধের মূর্তি, সীমাবিহার এবং একাধিক প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। অন্যদিকে মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির প্রতিবছর হাজারো দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীকে আকর্ষণ করে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সোনাদিয়া দ্বীপ একটি বিশেষ আকর্ষণ। লাল কাঁকড়া, ম্যানগ্রোভ বন, কেয়াবন এবং মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত এই দ্বীপকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ককে দেশের সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণপথগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
টেকনাফ জেটি, মাথিনের কূপ এবং টেকনাফ ন্যাচার পার্কও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ইতিহাস, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে এসব স্থান পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রসৈকতের বাইরেও কক্সবাজারে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান পর্যটন শিল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যথাযথ উন্নয়ন, পরিচর্যা এবং প্রচারণার মাধ্যমে কক্সবাজারকে বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক মানের বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
# ট্যাগ:
কক্সবাজার, ঈদুল আজহা, পর্যটক, সমুদ্রসৈকত, লাবণী পয়েন্ট, কলাতলী, সুগন্ধা, শাহপরীর দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, মেরিন ড্রাইভ, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, রামু বৌদ্ধ বিহার, আদিনাথ মন্দির, টেকনাফ, বাংলাদেশ পর্যটন, ভ্রমণ সংবাদ