Loading...

  • 25 May, 2026

ঢাকার ময়লা বহন করেন যারা, তাদের জীবনই যেন সবচেয়ে অবহেলিত

ঢাকার ময়লা বহন করেন যারা, তাদের জীবনই যেন সবচেয়ে অবহেলিত

রাজধানী ঢাকার ঝকঝকে সড়ক, পরিষ্কার আবাসিক এলাকা কিংবা রেস্তোরাঁর পরিচ্ছন্ন পরিবেশের পেছনে প্রতিদিন নিরবে কাজ করে যাচ্ছেন হাজারো বর্জ্যকর্মী। কিন্তু যাঁদের ঘামে শহর পরিচ্ছন্ন থাকে, তাঁদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অবহেলা, কষ্ট আর অনিরাপত্তায় ঘেরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভ্যান ঠেলে বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর ময়লা সংগ্রহ করেন রুবেল, সাইদুর, নয়ন, মোশাহিদদের মতো অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। দুর্গন্ধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর দীর্ঘ কর্মঘণ্টা যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কসংলগ্ন সড়কে দেখা যায়, একটি রিকশা ভ্যানভর্তি পচা-বাসি খাবার, প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা ধরনের আবর্জনা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন দুজন শ্রমিক। তাদের একজন তরুণ রুবেল, অন্যজন কিশোর সাইদুর। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা-৫টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁ থেকে ময়লা সংগ্রহ করেন তারা। মাস শেষে রুবেলের বেতন ১৩ হাজার টাকা আর সাইদুর পান ১০ হাজার টাকা। অথচ এই আয়ে রাজধানীতে বাসাভাড়া, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানো অত্যন্ত কঠিন।

রুবেল জানান, ময়লার কাজ অত্যন্ত কষ্টের। দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় কাটাতে হয়। তারপরও মাস শেষে পাওয়া টাকায় ঠিকমতো সংসার চলে না। তাই ময়লার মধ্য থেকে পাওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, কাগজ, বোতল ও ধাতব পণ্য বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয় করতে হয়। সেই ভাঙারি বিক্রি করেই তারা মাসে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন, যা ভাগাভাগি করে নিতে হয়।

শুধু রুবেল-সাইদুর নন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় হাজারো শ্রমিক একইভাবে কাজ করছেন। কোথাও মাসিক ১০ থেকে ১৭ হাজার টাকা বেতন, কোথাও আবার কোনো বেতনই নেই। বিশেষ করে গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় অনেক শ্রমিক শুধুমাত্র ভাঙারি বিক্রির টাকার ওপর নির্ভর করেই জীবিকা চালান। প্রতিদিন একটি ভ্যান থেকে গড়ে ১০ কেজি পর্যন্ত ভাঙারি পাওয়া যায়, যা বিক্রি করে দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

অথচ এই শ্রমিকদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ‘ময়লা-বাণিজ্য’। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায় করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বনানী এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ময়লার বিল নেওয়া হয়। এতে শুধু একটি এলাকাতেই মাসে কোটি টাকার বেশি আদায় হয়। কিন্তু সেই বিপুল অর্থের সামান্য অংশও পৌঁছায় না প্রকৃত শ্রমিকদের হাতে।

অভিযোগ রয়েছে, এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ময়লা সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই খাত নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর নেই। সিটি করপোরেশনের নির্দেশনায় মাস্ক, গ্লাভস, গামবুট ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ শ্রমিক সেগুলো পান না। আবার কোথাও কোথাও শিশু শ্রমিকও নিয়োজিত রয়েছে, যা আইনত নিষিদ্ধ। খোলা ভ্যানে ময়লা বহনের কারণে দুর্গন্ধ ও জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে শহরজুড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও বর্জ্যকর্মীরা এখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর একটি। তাদের জন্য ন্যায্য বেতন, স্বাস্থ্যবীমা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় যারা শহর পরিষ্কার রাখছে, তাদের জীবনই থেকে যাবে সবচেয়ে নোংরা ও অনিরাপদ বাস্তবতায়।

ট্যাগ:
#ঢাকার_ময়লা_ব্যবস্থাপনা #বর্জ্যকর্মী #ভ্যান_সার্ভিস #ময়লা_বাণিজ্য #ঢাকা_সিটি_করপোরেশন #শ্রমিক_জীবন #শিশুশ্রম #রাজধানী #বাংলাদেশ #সামাজিক_বৈষম্য #দুর্নীতি #পরিচ্ছন্নতা #মানবিক_সংকট #শ্রমিক_অধিকার #ঢাকা_নগরী

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy