Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

ভারত থেকে দেশে আসছে নতুন প্রজন্মের ১৯ রেলবগি

ভারত থেকে দেশে আসছে নতুন প্রজন্মের ১৯ রেলবগি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে ভারত থেকে আমদানি করা নতুন প্রজন্মের ১৯টি লিংকে হফম্যান বুশ (এলএইচবি) কোচ। বুধবার (১২ আগস্ট) ভারতের কাপুরথালার রেল কোচ কারখানা থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য তৈরি প্রথম রেকটি কারখানা ছাড়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবা আধুনিকায়ন ও ব্রডগেজ কোচের সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এসব নতুন কোচ আনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালনব্যবস্থা ও যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কোচগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রথম রেকে মোট ১৯টি কোচ থাকবে। এর মধ্যে তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয্যাযান, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ, ১১টি সাধারণ চেয়ার কোচ এবং দুটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোচ রয়েছে। এসব কোচ বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করা হবে।

নতুন কোচগুলো ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের একটি বড় চুক্তির অংশ। ২০২৪ সালে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রাইটসের মাধ্যমে এসব কোচ কেনার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তিটির মূল্য প্রায় ৯১৫ কোটি ভারতীয় রুপি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পুরো চালান বাংলাদেশে সরবরাহ করার লক্ষ্য রয়েছে।

ভারতের কাপুরথালার রেল কোচ কারখানায় মোট সাত ধরনের কোচ তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম রেকটি দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নেওয়া হবে। সেখানে কোচগুলোর বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা, মান যাচাই এবং পরিচালন উপযোগিতা পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর এগুলোকে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

ভারত থেকে বাংলাদেশে এলএইচবি কোচ এবারই প্রথম আসছে না। এর আগে ২০১৫-১৬ সালে ভারতীয় রেল কোচ কারখানা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি ব্রডগেজ এলএইচবি যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল। তবে এবারের কোচগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতা, রেলওয়ের পরিচালনব্যবস্থা এবং যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কিছু পরিবর্তন ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে।

নতুন কোচগুলোর যাত্রীসুবিধার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পাদানি, হেলানো যায় এমন আসন এবং আংশিক খোলা যায় এমন জানালা রাখা হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচগুলোতে ফ্যানের পাশাপাশি সমন্বিত সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা এবং যাত্রী সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও থাকবে। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ভ্রমণসুবিধা আগের তুলনায় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী যাত্রীদের সুবিধার জন্য নতুন কোচগুলোতে শিশু পরিচর্যার জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় প্রয়োজন বিবেচনায় নামাজের কক্ষও থাকছে। বাংলাদেশের যাত্রীদের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় কোচগুলোর ছাদও শক্তিশালী করা হয়েছে। ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ঝুঁকি কমানো এবং এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ঘটনা দেখা যাওয়ায় নতুন কোচের নকশায় এ বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন কোচগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরোপীয় মান ইএন ১৫২২৭ অনুসরণ করে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ করার লক্ষ্যে কোচগুলোর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াতে কোচের মূল কাঠামোতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় যাত্রীদের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

কোচগুলোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাতেও বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কোচগুলো ৪১৫ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় রেলের প্রচলিত কোচগুলোতে সাধারণত ৭৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের রেলওয়ের বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই নতুন কোচে ভিন্ন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে নতুন কোচগুলো ঠিক কোন ট্রেনে যুক্ত করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এসব কোচ ব্যবহার করে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে, নাকি বর্তমানে চলাচলরত কোনো ট্রেনের পুরোনো কোচ পরিবর্তন করা হবে—এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। কোচগুলোর কারিগরি পরীক্ষা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের পর রুট এবং ট্রেন নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন কোচ হাতে পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন রুটে নতুন রেক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম রেকের কোচ ব্যবহার করে নতুন যাত্রীসেবা চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করার আগে প্রতিটি কোচের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কারিগরি যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট রুট ও ট্রেন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে রেলপথে যাত্রী পরিবহন বাড়ার পাশাপাশি আধুনিক ও নিরাপদ কোচের চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে। পুরোনো কোচের পরিবর্তে নতুন প্রজন্মের কোচ যুক্ত করা গেলে যাত্রীসেবার মান উন্নত করার পাশাপাশি ট্রেনের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ, উন্নত আসন, সিসিটিভি, শিশু পরিচর্যা কক্ষ ও নামাজের কক্ষের মতো সুবিধা যাত্রীদের ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক করতে পারে।

চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ আমদানি করা হবে। ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম ১৯টি কোচের রেক বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ভারত থেকে নতুন প্রজন্মের ১৯টি এলএইচবি কোচ আসা বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবা আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, উন্নত যাত্রীসুবিধা, শিশু পরিচর্যার কক্ষ, নামাজের কক্ষ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনসহ এসব কোচ দেশের রেলযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে কোচগুলো কোন রুটে এবং কোন ট্রেনে যুক্ত হবে, সে সিদ্ধান্ত পরীক্ষামূলক ও কারিগরি প্রক্রিয়া শেষে নেওয়া হবে।