মাছ, মাংস ও ডিমের উচ্চ দামের কারণে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক স্বস্তির খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল সবজি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সবজির বাজারেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। প্রায় এক দশক আগে ১ হাজার টাকা নিয়ে বাজারে গেলে যে পরিমাণ সবজি কেনা যেত, বর্তমানে একই অর্থে তার অর্ধেক পরিমাণও কেনা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর বাজারে ২০১৭ সালের তুলনায় অধিকাংশ সবজির দাম দ্বিগুণ, তিন গুণ কিংবা তারও বেশি বেড়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের জাতীয় গড় খুচরা বাজারদর এবং চলতি সময়ের বাজারদরের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, গত নয় বছরে বেশ কয়েকটি সাধারণ সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে বেগুনের মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি বেগুনের গড় দাম ছিল ৪০ টাকা ৭১ পয়সা। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ গোল বেগুনের দাম প্রায় ২৬৮ শতাংশ বেড়েছে।
দাম বৃদ্ধির দিক থেকে শসাও রয়েছে শীর্ষে। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি শসার গড় দাম ছিল ২৯ টাকা ৭৮ পয়সা। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। সর্বোচ্চ হিসাবে এর দাম বেড়েছে প্রায় ২৩৬ শতাংশ। একইভাবে ধুন্দলের দাম ২৯ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ টাকা হয়েছে। বরবটির দাম ৩৯ টাকা ৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং করলার দাম ৩৯ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় উঠেছে।
পটোল, কচুর লতি ও কাঁকরোলের বাজারেও একই ধরনের মূল্যচাপ দেখা যাচ্ছে। পটোলের দাম ২০১৭ সালের ৩৩ টাকা ৪৮ পয়সা থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৮০ টাকা কেজি হয়েছে। কচুর লতি ৩৫ টাকা ৫৬ পয়সা থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ টাকা এবং কাঁকরোল ৪৫ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
টমেটোর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৭ সালে টমেটোর গড় দাম ছিল ৫৯ টাকা ৮৫ পয়সা। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে একই পণ্য ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম এই সবজিটির দামও দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
তবে সব ধরনের সবজির দাম একই হারে বাড়েনি। দেশি আলুর ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি দেশি আলুর গড় দাম ছিল ২১ টাকা ৩৫ পয়সা। বর্তমানে তা প্রায় ৩০ টাকা। অর্থাৎ নয় বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। একইভাবে পেঁপের দাম ২৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ টাকা হয়েছে।
একই সবজির ঝুড়িতে বাড়তি ব্যয় ১,৪৯০ টাকা
সবজির বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বোঝা যায় একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক কেনাকাটার হিসাবেও। আলু, বেগুন, করলা, শসা, টমেটো, পটোল ও ঢ্যাঁড়শ—এই সাত ধরনের সাধারণ সবজি মাসে চার কেজি করে কিনলে প্রায় নয় বছর আগে একটি পরিবারের ব্যয় হতো প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা। বর্তমানে একই পরিমাণ সবজি কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ টাকা। অর্থাৎ একই সবজির ঝুড়ির পেছনে পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪৯০ টাকা। শতকরা হিসাবে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে একটি পরিবারের গড় মাসিক খাদ্য ব্যয় ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৩ টাকা। সেই হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমানে শুধু সাত ধরনের সাধারণ সবজি কিনতেই একটি পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে।
সবজির এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর। মাছ, মাংস ও ডিমের দাম আগে থেকেই অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে এসব পরিবারের একটি বড় অংশ তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য সবজির ওপর নির্ভর করত। কিন্তু সবজির দামও দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।
রাজধানীর তুরাগের নতুন বাজারে বাজার করতে আসা আমিনুল ইসলাম জানান, সবজির দাম এতটাই বেড়েছে যে পরিবারের বাজার বাজেটের বড় একটি অংশ এখন সবজি কিনতেই চলে যাচ্ছে। আগে একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কেনা গেলেও বর্তমানে বাজেটের কারণে এক বা দুই ধরনের সবজি কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ
দীর্ঘমেয়াদে সবজির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারজাতকরণের খরচ বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। এর সঙ্গে চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং কোথাও কোথাও সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে। বেগুন, শসা, বরবটি, করলা, পটোল ও ধুন্দলের মতো সবজির দাম এ কারণে দ্রুত বেড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামে গিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকার কারণেও পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে পরিবারগুলোকে খাদ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমন্বয় করতে হচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে খাবার কিনছেন, আবার অনেকে অপেক্ষাকৃত কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এতে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা গেলে সবজির বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
সবজিকে সাধারণ মানুষের স্বস্তির খাদ্য হিসেবে ধরে রাখার জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ন্যায্য ও কার্যকর বাজারব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে যেসব সবজির ওপর নিম্ন আয়ের মানুষ নির্ভরশীল, সেগুলোর দামও ক্রমাগত বাড়তে থাকলে দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।