ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ‘সমকামিতার’ অভিযোগ ওঠার পর তাদের হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের আসন বাতিল করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন হলটির প্রোভোস্ট ড. মো. আখতারুজ্জামান।
হল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি জানার পর প্রাথমিকভাবে তাদের হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর তাদের হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা কী এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার তদন্তে হলের হাউস টিউটর ও সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দায়িত্ব হবে অভিযোগের বিষয়ে পাওয়া তথ্য, ছবি ও ভিডিওসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও অভিযোগের পেছনের পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
মুজিব হল সংসদের জিএস আহমেদ আল সাবাহ দাবি করেন, অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীই প্রথম বর্ষের। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রক্টরের উপস্থিতিতে তাদের হলের আসন বাতিল করা হয় এবং স্থানীয় অভিভাবকদের উপস্থিতিতে তাদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে আরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের একজন অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ঘটনাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। তিনি বলেন, তিনি এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং তার বিরুদ্ধে যেসব ছবি ও ভিডিওকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর প্রেক্ষাপটও সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি।
ওই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তার রুমমেট বেশ কিছুদিন ধরে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে প্রশ্ন করছিলেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব নিয়েও তাকে প্রশ্ন করা হতো। তিনি দাবি করেন, নিজের এলাকার পরিচয়ের কারণে তাকে নিয়ে আগে থেকেই নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছিল।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর আরও দাবি, তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ছবি ও ভিডিও তার রুমমেট ধারণ করেছিলেন এবং পরে সেগুলো হল সংসদের জিএসের কাছে দেওয়া হয়। রুমমেটের সঙ্গে জিএসের ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর তাকে ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। ফলে পুরো ঘটনাটির সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এ ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। হল প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নিলেও তদন্ত কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা, ছবি-ভিডিওর প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং বহিষ্কারের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তদন্তের ফলাফল জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত বিষয়, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই এবং প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে ছবি বা ভিডিওর মতো ডিজিটাল উপাদানের প্রেক্ষাপট ও সত্যতা যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে তদন্ত কমিটি গঠনের পর এখন তাদের প্রতিবেদনের দিকে নজর রয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, হল প্রশাসন এবং অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আবার অভিযোগের ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপট পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগও থাকবে।
সব মিলিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দুই শিক্ষার্থীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পর তাদের প্রাথমিকভাবে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। তাই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে।