Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

সামিট-এক্সিলারেট টার্মিনাল চালু, বাড়ছে গ্যাসের সরবরাহ

সামিট-এক্সিলারেট টার্মিনাল চালু, বাড়ছে গ্যাসের সরবরাহ

টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিক সক্ষমতায় চালু হয়েছে। তবে গ্যাসের সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনের মাধ্যমে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম তদারকি করে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আমদানি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে পেট্রোবাংলার আওতাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোর ৪টা থেকে সামিটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট এলএনজি গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা গ্যাস সংকটের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, বর্তমানে দুই টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করছে, আর এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আংশিক সরবরাহ চালু হয়েছে। সরবরাহ বাড়ায় আবাসিক, শিল্প ও অন্যান্য খাতের গ্রাহকেরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অগ্নিকাণ্ডে বন্ধ হয়েছিল এক্সিলারেটের টার্মিনাল

মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিটের। এক্সিলারেটের টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।

গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং বিভিন্ন খাতে সংকট তীব্র হয়। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে সমস্যার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহও ব্যাহত হয়। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। একই সময়ে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পেট্রোবাংলার সূত্র অনুযায়ী, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটি অক্ষত ছিল। অক্ষত বয়লার থেকে গত ৬ আগস্ট সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে শুক্রবার বিকেলে কারিগরি ত্রুটির কারণে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ত্রুটি মেরামতের পর পুনরায় ওই বয়লার থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।

তবে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এটি পুনরায় চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ চলছে। বয়লারটি চালুর আগে নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এ পরীক্ষা করতে প্রায় ৭২ ঘণ্টা টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হতে পারে। তবে কখন এই কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি চূড়ান্ত হয়নি।

সামিটেও কমেছিল সরবরাহ

এদিকে এলএনজি সরবরাহের ঘাটতির কারণে সামিটের টার্মিনাল থেকেও গত কয়েক দিনে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সোমবার সামিটের সরবরাহ কমে যায় এবং মঙ্গলবার তা প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সরবরাহ আরও কমিয়ে প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট রাখা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর শুক্রবার বঙ্গোপসাগরে ভিটলের একটি এলএনজিবাহী জাহাজ পৌঁছায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ওই জাহাজ থেকে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি খালাস শুরু হয়। খালাস প্রক্রিয়ায় প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগে। তবে জাহাজ থেকে খালাস শুরুর আগেই সামিট টার্মিনালে সংরক্ষিত এলএনজি থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়। শুরুতে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ভোররাতে তা বেড়ে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়। সামিট আরও কয়েক কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সৌদি আরামকোর এলএনজি জাহাজ ফেরত

এর আগে বঙ্গোপসাগরে আসা সৌদি আরামকোর একটি এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে গ্যাস গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। টার্মিনালের সঙ্গে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের কারিগরি সামঞ্জস্য না থাকায় শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি ছিল। এমন অবস্থায় জাহাজটি কয়েক দিন সাগরে অবস্থান করলেও সেখান থেকে এলএনজি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়াও ওই জাহাজ থেকে এলএনজি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জাহাজটি ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর পরিবর্তে আরামকো নতুন একটি এলএনজি জাহাজ পাঠাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ভিটল এশিয়ার নতুন জাহাজ থেকে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি গ্রহণে কোনো সমস্যা হয়নি।

এখনো ঘাটতি রয়েছে

দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা গেলে অধিকাংশ খাতে মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। তবে স্বাভাবিক সময়েও রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে দৈনিক প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ দ্রুত কমে যায়। শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল। দুই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ানোর পর তা প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় চালু হলে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে এবং বর্তমানে তৈরি হওয়া ঘাটতি অনেকটাই কমে আসতে পারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার পুনরায় চালু, প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা এবং এলএনজি আমদানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।