রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও স্থানীয় যুবদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্য সচিব কে এম চঞ্চলের অনুসারীরা কয়েকটি দোকান বসিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে গিয়ে দোকানগুলো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রাথমিক উত্তেজনার পর কে এম চঞ্চলের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালান। তবে যুবদল নেতা কে এম চঞ্চল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
ঘটনার খবর দ্রুত ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের শতাধিক নেতা-কর্মী নিউমার্কেটের প্রিয়াঙ্গন মার্কেটসংলগ্ন বসুন্ধরা গলিতে কে এম চঞ্চলের রাজনৈতিক কার্যালয়ের দিকে যান। সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পাশাপাশি মারামারিতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহদপ্তর সম্পাদক হাসান ফরাজি জানিয়েছেন, সংঘর্ষে তাদের সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিন্স খন্দকার, সুমন শিকদার, সদস্য সাগর খান, সায়মন ইসলামসহ অন্তত ১৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে উভয় পক্ষের মোট আহতের সংখ্যা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্য সচিব কে এম চঞ্চল তার বিরুদ্ধে আনা হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। তার দাবি, ফুটপাতে যুবদলের কিছু কর্মী ব্যবসা করে আসছিলেন। ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের পরিচয় দিয়ে কিছু বহিরাগত সেখানে গিয়ে তাদের মারধর করেছে। পরে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহসিন উদ্দিন জানান, ফুটপাতে দোকান বসানো এবং ওই এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। পুলিশের হস্তক্ষেপে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকার ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফুটপাতে দোকান বসানো, উচ্ছেদ এবং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এর আগে কয়েক দফায় ছোটখাটো বিরোধ ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। তবে মঙ্গলবারের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বড় সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং এতে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।
ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক এলাকায় অবৈধ দোকান ও অস্থায়ী ব্যবসার কারণে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়। একই সঙ্গে এসব দোকানের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। নিউমার্কেট এলাকার ঘটনাটিও সেই বৃহত্তর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মঙ্গলবারের সংঘর্ষের পর নিউমার্কেট ও ঢাকা কলেজ এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আর অবনতির দিকে না যায়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে উভয় সংগঠনের ঊর্ধ্বতন নেতাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সব মিলিয়ে, ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত দুই রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ফুটপাতের অবৈধ দখল, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় আধিপত্যের বিষয়গুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।