ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের নতুন পর্যায়ে সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি এই কৌশলকে ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, অ্যানাকোন্ডা যেভাবে শিকারকে পেঁচিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে দুর্বল করে, যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর চাপ বাড়িয়ে ইরানকে চাপে ফেলতে চাইছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলী আকবর দারেইনি বলেন, সরাসরি সামরিক আঘাতের পরিবর্তে একটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত করে তাকে আলোচনার টেবিলে আনাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। তাঁর দাবি, গত পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায় এখন ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ আগস্ট ইরানকে সহায়তা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। এর ফলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, তেল বিক্রি, অর্থনৈতিক লেনদেন ও আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
এই কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইরানের সমুদ্রপথ ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। এই অবরোধের উদ্দেশ্য ইরানের জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করা।
ইরানের জন্য কৌশলটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা। বিশেষ করে দুবাইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ইরানের বাণিজ্যিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশের সুযোগ কমিয়ে দিলে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে, যা তেহরানের জন্য নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইরান অতীতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও তার অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সচল রেখেছে। তেহরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার অবস্থান জানিয়েছেন। ইরান আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি, তবে আলোচনা ও আত্মসমর্পণকে এক বিষয় হিসেবে দেখতেও রাজি নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ওয়াশিংটন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটি তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে আরও কঠোর শর্ত আরোপের চেষ্টা চলছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ, সামুদ্রিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই চাপের প্রভাব শুধু তেহরানের অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে। ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ওই অঞ্চলে সংঘাত ও নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার মার্কিন কৌশল সফল হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ইরানের অবস্থানও এখন পর্যন্ত কঠোর। তেহরান সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা খোলা রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙার জন্য প্রয়োজন হলে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের বর্তমান কৌশলের লক্ষ্য দ্রুত কোনো একটি সামরিক বিজয় অর্জনের চেয়ে ইরানের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা, যাতে দেশটির নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হয়। তবে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে দুর্বল করার পাশাপাশি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চীন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ কোনো আনুষ্ঠানিক মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার নাম নয়; এটি ইরানের এক বিশ্লেষকের ব্যবহৃত একটি রূপক। এর মাধ্যমে ইরানকে সামরিকভাবে সরাসরি পরাস্ত করার পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগের বর্তমান কৌশলকে বোঝানো হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই চাপ তেহরানকে আলোচনায় আনতে সক্ষম হবে, নাকি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত করবে—তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ, ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর।