Loading...

  • 24 Aug, 2026
সর্বশেষ

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তার কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তার কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি রাজপথের আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ছিল নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক ও বিএনপির সাংগঠনিক সংকটের সময়ে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করেন। ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।

তৎকালীন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে বড় জনসভায় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। একই বছরের ২৮ অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পর তাকে গৃহবন্দী করা হয়। পরবর্তী কয়েক বছরেও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে একাধিকবার তাকে আটক ও গৃহবন্দী করা হয়।

১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচিতে অংশ নেন খালেদা জিয়া। ধর্মঘট, ঘেরাও, গণপ্রতিরোধসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তেও বিএনপির নেতৃত্বে তিনি অনড় ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পেছনে যে সম্মিলিত রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেখানে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ তৈরি হয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে।

১৯৯১ সালের সরকারের সময়ে অর্থনীতি, শিক্ষা ও নারী শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি নেওয়া হয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগের কারণে তাঁর সরকারকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মধ্যে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকার পরিচালনা করেন।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সে সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেন। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো মারা যান।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। তাকে কারাবন্দী করা হয় এবং পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকতে হয়। বিএনপি ও তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে হয়রানি ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলেছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি নতুন পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বিএনপি ও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, সরকার পরিচালনা, বিরোধীদলীয় রাজনীতি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট—প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অবস্থান তৈরি করেন।

তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতভেদ থাকলেও সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক। অন্যদিকে তাঁর সমালোচকেরা তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমর্থন ও সমালোচনা—দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই বিদ্যমান।

তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা। আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধী দলের রাজনীতি, কারাবরণ ও অসুস্থতা—বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও উত্তরাধিকার আগামী দিনেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।