Loading...

  • 17 Oct, 2026
সর্বশেষ

মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, প্রাণ গেল সাড়ে ৪ বছরের আভানের

মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, প্রাণ গেল সাড়ে ৪ বছরের আভানের

রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে শিশুটির পরিবারের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সামান্য জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি

শিশুটির বাবা মো. মৃদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর সামান্য জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসকেরা শিশুটিকে ডেঙ্গু রোগী হিসেবে সন্দেহ করে চিকিৎসা শুরু করেন। তবে পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে একাধিকবার রক্ত পরীক্ষা ও ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। পরিবারের দাবি, প্রতিবারই ডেঙ্গু পরীক্ষার ফলাফল ‘নেগেটিভ’ আসে।

পরিবারের অভিযোগ, ডেঙ্গুর পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসার পরও চিকিৎসকেরা একই ধরনের চিকিৎসা চালিয়ে যান। তাদের দাবি, শিশুটির ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো আলামত না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই সন্দেহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন আভান স্বাভাবিকভাবেই ছিল। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে খাবারও খাচ্ছিল এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল। কিন্তু গত ২ অক্টোবর হঠাৎ করেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।

এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিশুটির পালস পাওয়া যাচ্ছে না এবং তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া প্রয়োজন। পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুটিকে অন্য কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের ইচ্ছা প্রকাশ করা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে দেরি করা হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের। তারা শিশুটির বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতির লিখিত কেস সামারি চাইলেও তা দিতে টালবাহানা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইসিইউতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ

পরিবারের আরও অভিযোগ, আভানকে আইসিইউতে নেওয়ার পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেখানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। তিনি মুঠোফোনের মাধ্যমে চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং সেই অনুযায়ী শিশুটির চিকিৎসা চলছিল বলে দাবি করেছে পরিবার।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে বারবার আশ্বাস দিয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অবস্থার অবনতি অব্যাহত থাকে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানের মৃত্যু হয়।

মেডিকেল নথি নিয়েও অভিযোগ

শিশুটির মৃত্যুর পর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র ও রিপোর্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা নিয়েও জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল নথি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে চাপের মুখে কিছু মেডিকেল ডকুমেন্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই নথিপত্রে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিন্ড্রোমের তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্যকে ভিত্তি করে চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। তবে শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা ভুল হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।

জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চায় পরিবার

সাড়ে চার বছরের শিশু আভানের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ, সুস্থ অবস্থায় হেঁটে হাসপাতালে যাওয়া শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। তাই তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ঘটনাটি নিয়ে চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা ও অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং শিশুটির চিকিৎসাকালীন ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

শিশু আভানের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার এখন জড়িতদের জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। ঘটনাটি নিয়ে স্বজনদের অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারে।