ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে পরিচালিত ১২ বছরের মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক মিশনের ইরাক পর্বের সমাপ্তি হলো। ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই উত্তর ইরাকের একটি বিমানঘাঁটি থেকে শেষ মার্কিন সেনারা দেশটি ছেড়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রত্যাহারকে ‘খুব ব্যয়বহুল নরকযাত্রার’ সমাপ্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতেই ইরাকের বেশির ভাগ এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল। সর্বশেষ সেনাদের প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির এই পর্ব শেষ হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাগদাদের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতার ভিত্তিতেই এই প্রত্যাহার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাকভিত্তিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আইএসবিরোধী জোটের সদর দপ্তর জর্ডানে স্থানান্তরিত হবে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্পের মন্তব্য
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ইরাক থেকে জোটের সেনা ও সরঞ্জাম প্রত্যাহারের এই সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। ট্রাম্প ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততাকে ‘কোয়াগমায়ার’ বা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে জড়িয়ে পড়ার পেছনে ‘খুব খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ ভূমিকা রেখেছিল।
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে গিয়েছিল একটি খিলাফতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং বর্তমানে সেই খিলাফত আর নেই। তাই মার্কিন বাহিনী এখন দেশে ফিরে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি প্রত্যাহারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক—দুই দেশের জন্যই বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১২ বছরের সামরিক মিশনের সমাপ্তি
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ২০১৪ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ইরাকি বাহিনী ও কুর্দি যোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে জোটটি আইএসের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনর্দখলে ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ইরাকে আইএসের তথাকথিত খেলাফতের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়। এরপরও দেশটির বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় আইএসের অবশিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চলেছে।
বুধবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিশনের সমাপ্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ইরাকি নেতৃত্ব ও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি এই ঘটনাকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন পর্যায়ের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ইরাকে নতুন পর্যায়
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব দেশটির নিজস্ব বাহিনীর ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হবে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক মিশনের সমাপ্তিকে ওয়াশিংটনও যুদ্ধকালীন জোটের কার্যক্রম থেকে ইরাকের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থায় রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং আইএসের অবশিষ্ট সদস্যদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।