হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জরুরি চাহিদা মেটানো এবং সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আন্তর্জাতিক কোটেশন পদ্ধতিতে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। প্রস্তাবিত তিন কার্গোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১১২ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৪ টাকা। তবে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আপাতত দুই কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমোদিত দুই কার্গো এলএনজি জুন মাসের শেষাংশ এবং জুলাইয়ের শুরুর দিকে দেশের বিদ্যমান গ্যাস চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কিছু চালান দেশে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তৃতীয় কার্গো কেনার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিলে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত কোনো চালান দেশে পৌঁছে যায় অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য আরও কমে আসে, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো সম্ভব হবে। এ কারণেই তৃতীয় কার্গোর বিষয়ে আপাতত অপেক্ষার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
এলএনজির মূল্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত মূল্যসূচক, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোর গড় দর বিবেচনায় নিয়ে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগিতামূলক দামে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হওয়ায় এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে। তাই স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।